বোয়িংয়ের সঙ্গে ৪৫ হাজার কোটির চুক্তি বিমানের। এই খবরের পরও হাল ছাড়েনি ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম এয়ারবাস। বাংলাদেশের আকাশ ঘিরে বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান চুল পরিমাণ ছাড়তে রাজি নয়। তাদের ঝুলিতে অনেক কম দামের প্রস্তাব।
দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন করে। আকর্ষণীয় ছাড় এবং কৌশলগত শর্ত সামনে এনে আবারও তারা ঢাকায়। বাজার দখলের হিসাব কষেই ফিরেছে আলোচনার টেবিলে। রাজনৈতিক কৌশল আর অর্থনৈতিক সমীকরণই নির্ধারণ করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
যদিও এই মুহূর্তে বহরে নতুন উড়োজাহাজ সংযোজনের প্রয়োজন নেই বিমানের। ড্রিমলাইনারসহ যে উড়োজাহাজগুলো বহরে, সেগুলোরই সক্ষমতার পুরোটা হয় না ব্যবহার। না হলেও তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বোয়িং নতুন করে ১৪টি গছিয়েছে। বলা যায়, সরকারকে বাধ্য করেছে। তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে এ চুক্তি করেছে। কিন্তু বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মত, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবও কম নয়। তারাও মরিয়া। পাশ কাটানো যাচ্ছে না। ফ্রান্স, জার্মানিসহ একাধিক দেশের যৌথ সংস্থা। তাদের রাজনৈতিক প্রভাবও যথেষ্ট।’
ঈদের ছুটির আগে আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এক ফলোআপ চিঠি পাঠিয়েছে এয়ারবাস। জানিয়েছে, জুনেই তারা বসতে চায় সরকারের সঙ্গে। স্মারক স্বাক্ষর করতে চায় সমঝোতা। লক্ষ্য A350-900 এবং A321neo মডেলের উড়োজাহাজ বিক্রি।
এয়ারবাসের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রাফায়েল গোমেজ নোয়া চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক শর্ত নিশ্চিত করে আগামী জুলাইয়ের শুরুতেই আলোচনা চূড়ান্ত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। বিমানের জন্য আগের প্রস্তাবনা নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী তারা।
এয়ারবাসের বিক্রি প্রস্তাব বিশ্লেষণে মিলেছে, প্রাথমিকভাবে চারটি দূরপাল্লার A350-900 উড়োজাহাজ বিক্রির পরিকল্পনা তাদের। উড়োজাহাজগুলো ২০৩৪ ও ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ হবে। প্রথমটি ২০৩৪ সালের জানুয়ারি-জুনে, দ্বিতীয়টি একই বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে, তৃতীয়টি ২০৩৫ সালের জানুয়ারি-জুনে এবং চতুর্থটি একই বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে। নথির আর্থিক খতিয়ান বলছে, একটি A350-900 উড়োজাহাজের ভিত্তিমূল্য ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৯০ লাখ ৭৬ হাজার ১৫০ মার্কিন ডলার।
তবে বিভিন্ন খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে মোট ২৬ কোটি ৩৫ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ ডলারের ক্রয় প্রণোদনা বা ছাড়। ছাড়ের খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে— স্ট্যান্ডার্ড ক্রেডিট ১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার, নতুন অপারেটর ক্রেডিট ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার, ব্যতিক্রমী ক্রেডিট ২ কোটি ডলার, কাস্টমাইজেশন ক্রেডিট ৬৭ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ ডলার, অতিরিক্ত ক্রেডিট ৫৮ লাখ ডলার এবং ফ্লাইট অপারেশনস ক্রেডিট ২০ লাখ ডলার। সব ছাড় সমন্বয়ের পর প্রতিটি উড়োজাহাজের সম্ভাব্য নিট মূল্য দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫০ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা)।
প্রস্তাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে সমগোত্রীয় উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে অন্য কোনো নির্মাতার সঙ্গে আলোচনায় না যাওয়ার বাধ্যবাধকতা। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন ও একচেটিয়া আলোচনায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে এ শর্ত। অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও নির্ধারণ করা হয়েছে ধাপভিত্তিক কাঠামো।
উড়োজাহাজ ডেলিভারির আগে মোট মূল্যের ১৭ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে অগ্রিম কিস্তিতে। অবশিষ্ট ৮৩ শতাংশ ডেলিভারির সময় এককালীন পরিশোধের শর্ত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই না হলে অগ্রিম প্রদত্ত অর্থ বাজেয়াপ্ত করার বিধানও উল্লেখ আছে প্রস্তাবে।
প্রস্তাবনায় পাইলট ও প্রকৌশলীদের জন্য রাখা হয়েছে বড় প্রশিক্ষণ প্যাকেজ। চারটি উড়োজাহাজের বিপরীতে ৪০ জন পাইলটকে বিদেশে দেওয়া হবে টাইপ রেটিং ও আনুষঙ্গিক প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া দেওয়া হবে প্রথম উড়োজাহাজ সরবরাহের পর ঢাকায় ১৮০ দিনের ফ্লাইং সুপারভিশন। ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ট্রেইনি-ডে। পাশাপাশি আরও কিছু প্রশিক্ষণ সুবিধা আগাম ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও চুক্তি বাতিল হলে এর ব্যয় ফেরত দেওয়ার শর্ত রয়েছে।
দাম নির্ধারণে ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও রাখা হয়েছে বিবেচনায়। বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে হলে অতিরিক্ত খরচ উভয়পক্ষ বহন করবে। তবে সূচক কমলেও বেস প্রাইসের নিচে দাম নামবে না।
২০২৩ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরে ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর কৌশলগত চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি করেছে বিমান। আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট উড়োজাহাজ কেনা হবে। আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটির দাম ৩ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
এদিকে, বোয়িংয়ের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে নতুন করে উড়োজাহাজ কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলছিলেন, ‘বর্তমান বহরের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত না করে নতুন বিনিয়োগে গেলে তা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এত দীর্ঘমেয়াদি ডেলিভারি সময়সীমার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকেই যায়।’
তার মতে, এয়ারবাস ও বোয়িংয়ের মধ্যে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বরাবরই তীব্র আর বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে তা আরও সক্রিয়ভাবে প্রতিফলিত হয়। ‘এয়ারবাসের নতুন করে প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসা সেই প্রতিযোগিতারই অংশ। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে কোন প্রস্তাবটি অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক ও অপারেশনালভাবে টেকসই, তার ওপর। একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিদ্যমান বহরের একটি বড় অংশ আগামী বছরগুলোতে বয়সসীমার দিকে যাবে; ফলে বহর নবায়ন অনিবার্য হয়ে উঠবে, সেটি এয়ারবাস বা বোয়িং যেখান থেকেই হোক, সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে’— যোগ করেন ওয়াহিদুল আলম।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানালেন, বহর সম্প্রসারণের বিষয়ে সব আন্তর্জাতিক প্রস্তাবই গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রুট সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের চেয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা ও সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।’
একই ধরনের সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ও। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সব দিক বিশ্লেষণ করেই সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। আর জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে আগামীর সময়। তাকে বার্তা পাঠানো হলে পরে কথা বলবেন বলে জানান। যদিও সে অনুযায়ী পরে তার মোবাইল ফোনে কল করে সাড়া মেলেনি। অবশ্য সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন উড়োজাহাজ সংযোজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, অপারেশনাল সক্ষমতা এবং বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি— সব দিকই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গত বছরের জুলাইয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্তের পরও এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর জোরালো কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো। এয়ারবাস না কিনলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি প্লাস সুবিধা ও সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন ইউরোপীয় কূটনীতিকরা।
এমনকি তখন ঢাকায় জার্মানির, ফরাসি রাষ্ট্রদূতসহ ইউরোপের চার দেশের কূটনীতিকরা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে এয়ারবাস কেনার প্রস্তাবে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, এয়ারবাস না কেনা হলে তা ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অংশীদারি সম্পর্কের ‘মনোভাবের’ ওপর ফেলতে পারে নেতিবাচক প্রভাব। জার্মানিসহ ইউরোপীয় কূটনীতিকরা দফায় দফায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ ইউরোপের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। এয়ারবাসের মতো বড় বিনিয়োগ ইউরোপ থেকে না এলে ভবিষ্যতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এর একটা প্রভাব পড়তে পারে।
এয়ারবাস না কিনলে বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে— গত বছর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন ঢাকায় জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিক্যাব আয়োজিত ডিক্যাব টকে জার্মান রাষ্ট্রদূত এমন সতর্কবার্তা দেন। সেদিন জার্মানির রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অংশীদার এবং আশা করি এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বিভিন্ন ইস্যু যেমন জিএসপি প্লাস-আলোচনার পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এয়ারবাস কেনার মতো বড় সিদ্ধান্তগুলোও আলোচনার মেজাজ নির্ধারণ করে।’
রাষ্ট্রদূত আরও বলেছেন, ‘অবশ্যই এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। তবে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক জীবনের মতো প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব থাকে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর।’
এরই কয়েক দিন আগে ঢাকায় ফ্রান্স দূতাবাসে এক যৌথ বক্তব্যেও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।