ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছে না লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে। এতে সদর, রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার নদীতীরবর্তী জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা। মাছ না পাওয়ায় বাড়ছে ঋণের চাপ, পাশাপাশি সংসার চালানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জেলেরা।
সম্প্রতি মজুচৌধুরীর হাট, আলেকজান্ডার, চরফলকন ও চরসীতা এলাকার বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও জেলেরা কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না। দু-একটি মাছ ধরা পড়লেও সেগুলোর বেশির ভাগই আকারে ছোট।
জেলেরা বলছেন, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নদীতে অবস্থান করেও অনেক সময় প্রায় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে এনজিওর কিস্তি, দাদনের ঋণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কমলনগরের চরফলকন এলাকার জেলে মমিন উল্যাহ বলেন, আগে একবার জাল ফেললেই কিছু ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন চেষ্টা করেও দুই-চারটি মাছ নিয়ে ফিরতে হয়। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।
একই এলাকার জেলে দুলাল হোসেনের অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু অসাধু জেলে ও প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে মাছ শিকার করেছে। এর প্রভাব এখন নদীতে পড়ছে। তিনি বলেন, জাটকা নিধন বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট আরও বাড়বে।
রামগতির চরসীতা এলাকার জেলে আবু জাফর বলেন, আষাঢ় শুরু হলেও নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে। সামনে দাদনের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তায় দিন কাটছে।
ইলিশের সংকটের প্রভাব পড়েছে বাজারেও। লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন বাজারে এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা।
মজুচৌধুরীর হাটে মাছ কিনতে আসা তাছলিমা আক্তার বলেন, ভরা মৌসুমে দাম কমবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বাজারে মাছের সরবরাহ কম থাকায় দামও বেশি।
মাছের আড়তদার জয়নাল বলেন, গত বছরের একই সময়ে ঘাটে প্রচুর ইলিশ আসত। এবার সরবরাহ অনেক কম। ফলে আড়তগুলোও প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।
ইলিশ বিক্রেতা সিরাজ মিয়া বলেন, চাহিদার তুলনায় মাছ কম থাকায় দাম বেড়েছে। গত বছর যে মাছ ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার একই মাছ ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন রায়হান বলেন, সরকার প্রতিবছর ইলিশ রক্ষায় নানা কর্মসূচি নিলেও বাস্তবে নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ করা যায় না। এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে জেলে ও ভোক্তাদের।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মেঘনা নদীর নাব্যতা সংকট, ডুবোচর সৃষ্টি, জাটকা নিধন এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সাগর থেকে পর্যাপ্ত ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না।
লক্ষ্মীপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসাইন বলেন, নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি ও নাব্যতা সংকটের কারণে ইলিশের চলাচলে কিছুটা বাধা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া অধিকাংশ ইলিশ এখনো গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে। বৃষ্টিপাত ও নদীর পানিপ্রবাহ বাড়লে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ইলিশ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, জাটকা সংরক্ষণ, অবৈধ জাল জব্দ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ শিকার বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।