আর দশটা সাধারণ সকালের মতো ব্যস্ততা দেখা গেল না কারওয়ান বাজারে। ঈদের ছুটির রেশ কাটেনি এখনো, তাই চারপাশটা তুলনামূলক শান্ত। এই শান্ত পরিবেশের মধ্যেই ধীরপায়ে, থেমে থেমে হাঁটছেন আলী আহমেদ। পেশায় রাজমিস্ত্রি। হাতে তার বাজারের ফর্দ।
আগের মতো পুরো মাসের বাজার একসাথে করার সক্ষমতা হারিয়েছেন অনেক আগেই। বাড়িতে আছেন শুধু বৃদ্ধ বাবা-মা। সংসারের টানাপোড়েন, জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর কাজ নিয়মিত না পাওয়ার অনিশ্চয়তা মিলিয়ে আলী আহমেদের কেনাকাটার ধরনটাই বদলে গেছে।
আলী আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগে যখন চুক্তিভিত্তিক কাজ করতাম, মাসে বিশ হাজার টাকা আয় হলেও কোনো রকমে স্বস্তিতে সংসার চলে যেত। এখন সেটা আর কোনোভাবেই সম্ভব না। খরচ যে হারে বেড়েছে, আমাদের আয় তো সেই তুলনায় বাড়েনি।’
তার সংসারের সবচেয়ে বড় আর্থিক আঘাতটি এসেছে চালের বাজার থেকে। আলী আহমেদ জানান, ‘বাজারে সাধারণ মানের মোটা চালই এখন কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকা কেজিতে। মাঝে মাঝে বৃদ্ধ বাবা-মার জন্য একটু ভালো মানের বা সরু চাল কিনতে গেলে দাম গিয়ে ঠেকে ৮৫ টাকার কাছাকাছি। আগে যে চাল মাসের শুরুতে একবারে বস্তা ধরে কিনতাম, এখন তা ভাগ করে অল্প অল্প করে কিনতে হয়।’
আলী আহমেদের এই অভিজ্ঞতা কেবল কোনো একক ব্যক্তির সংকট নয়। এটি মূলত মূল্যস্ফীতির করাল গ্রাসে পিষ্ট দেশের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্য আয়ের শ্রমজীবী মানুষের ভোগব্যয় ও যাপনচিত্র বদলে যাওয়ার এক নির্মম বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
মাসের শুরুতে একবারে বাজার করার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এদেরকে বারবার ছোট ছোট পরিমাণে কেনাকাটা করতে হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে যাতায়াত ও খুচরা বাজারের ফেরে পড়ে তাদের মোট খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বেতন মেলেনি, ধার করা টাকায় খুচরা কেনাকাটা
রাজধানীর বাড্ডা কাঁচাবাজারে হাতে গোনা কয়েকশ টাকা নিয়ে বাজারের থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল রেহানা ইসলামকে। অন্যের বাসায় ঠিকে ঝি-এর কাজ করেন। মাসের প্রথম সপ্তাহ চললেও এখনো বেতন পাননি। ওদিকে ঘরের চাল-ডালও শেষ।
বাইরে থেকে তৈরি খাবার কিনে খাওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই অনন্যোপায় হয়ে পরিচিত একজনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে বাজারে এসেছেন।
রেহানা ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘ঈদে তো বড় বড় বাবুরা সব বোনাস পায়, কিন্তু আমাদের কপালে তো আর সবসময় বোনাস জোটে না। কোরবানির ঈদে মানুষের বাসা থেকে যেটুকু মাংস পেয়েছিলাম, তাও শেষ। এখন ঘরে কী রাঁধব? তাই ভাবলাম কিছু সবজি নিয়ে যাই।’
সংসারে আয়ের আরেকটি পথও এখন বন্ধ। তার ১৭ বছর বয়সী ছেলে ইসহাক ইসলাম আগে সদরঘাট এলাকায় কুলির কাজ করতেন। বর্তমানে সেই কাজও জোগাড় করতে পারছেন না তিনি। ফলে রেহানার একার আয়ের ওপর পুরো সংসারের বোঝা চেপেছে।
সেদিনের বাজারে রেহানা এক কেজি করলা (৮০ টাকা) এবং এক কেজি বেগুন (৬০ টাকা, তবে তিনি দুটো মিলিয়ে কিছুটা কমদরে পেয়েছেন) কিনতে গিয়েই খরচ করে ফেলেছেন ১৩০ টাকা। সঙ্গে নিয়েছেন কিছু চাল।
সবজি আর চালেই চলে গেছে প্রায় ২০০ টাকা। রান্নার জন্য তেল কিনতে গেলে আরও ২০০ টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল কেনার চিন্তা বাদ দিয়ে মাত্র ১০০ টাকার খোলা তেল কিনেই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
রেহানার আক্ষেপ, ‘এই ৪০০ টাকা দিয়ে আজ থেকে এক বছর আগেও কত বেশি বাজার করা যেত! এখন একই টাকায় থলের নিচে সামান্য কিছু জিনিস পড়ে থাকে। বাজারের যে দাম, তাতে আমাদের মতো মানুষের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।’
ঈদ পরবর্তী ক্রেতাশূন্য বাজার
শুক্রবার (৫ জুন) সকালে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজার, মেরুল বাড্ডা, পূর্ব রামপুরার বউ বাজার, তেজগাঁও বাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপস্থিতি খুবই কম। ব্যবসায়ীরা জানান, বহু পরিবার এখনো ঈদের ছুটি কাটিয়ে গ্রামে থেকে ঢাকায় ফেরেনি। ফলে বাজারগুলোতে চেনা কোলাহল নেই।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা সুমন সিকদার বলেন, তার দোকানে এখন যে সবজি রয়েছে তার প্রায় সবই ঈদের আগের কেনা। নতুন করে পাইকারি আড়ত থেকে পণ্য আনা হয়নি। ক্রেতা না থাকায় অনেক সবজি কেনা দামের চেয়েও কমে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।
সুমন বলেন, ‘শসা ও টমেটো এখন পুরা লসে বিক্রি করতেছি। শসা কেনা ছিল ৬০ টাকা কেজি, এখন বিক্রি করছি ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। টমেটোও মিলছে ৪০ টাকা কেজিতে। আর ১২০ টাকার নিচেই পাওয়া যাচ্ছে কাঁচামরিচ।’
একই চিত্র বাড্ডার বাজারেও। উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শিমুল বলেন, ‘আজকে বাজারে ক্রেতাও খুব কম, আমাদের কাছে নতুন সবজিও কম। আগের আনা মালই লোকসান ঠেকানোর জন্য বিক্রি করে দিচ্ছি।’
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। তবে পাকিস্তানি বা সোনালি মুরগির কেজি ঠেকেছে ৩৫০ টাকায়।
মাছের বাজারে মাঝারি ও স্বল্প আয়ের মানুষের ভরসা পাঙাস ও তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া সাধারণ মানের কই মাছ ২২০ টাকা, রুই মাছ ৩২০ টাকা, শিং মাছ ৩২০ টাকা এবং মৃগেল মাছ ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে ডিমের বাজারে কিছুটা স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। বাজারে ডজনপ্রতি বাদামি (ব্রাউন) ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায় এবং সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। অথচ কয়েক দিন আগেও এই ডিমের ডজন কিনতে ক্রেতাদের যথাক্রমে ১৪০ ও ১৩০ টাকা গুনতে হয়েছিল।
সবজির বাজারে কচু প্রতি কেজি ৮০ টাকা, মুলা ৪০ টাকা, শসা ৪০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ টাকা এবং বেগুন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি পিস চাল কুমড়ো ৫০ টাকা এবং লাউ ৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজারে আসা ক্রেতা রামিম বলেন, ‘মুরগি কিনতে গিয়ে অবাক হলাম। ঈদ যেতে না যেতেই ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে গেছে। ঈদের একদিন পরও এই মুরগি ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখেছি। তবে ডিমের দাম ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে, এটাই যা একটু স্বস্তি।’
মাছ বিক্রেতা ইউসুফ বলেন, ঈদের পর দুই দিন হলো তিনি দোকান খুলেছেন। তবে বিক্রি একেবারেই মন্দা। তার মতে, ‘ঈদের আগে মানুষ যার যার প্রয়োজনমতো বাজার করে রেখেছিল। এখন অনেকে ঢাকায় ফেরেনি, আর যারা আছে তারাও মেপে মেপে অল্প করে কিনছে। ফলে ক্রেতার এই আকাল।’
উত্তর বাড্ডা কাঁচাবাজারের ঠিক প্রবেশমুখের এক কোণায় দাঁড়িয়ে পুরোনো কাঁধের ব্যাগটি খুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে বাজারের হিসাব মেলাচ্ছিলেন মধ্যবয়সী গৃহিণী সুহেলী। স্বামী ঢাকায় পায়েচালিত রিকশা চালান। স্বামীর দৈনিক আয়ের কোনো ভরসা নেই—কোনো দিন আয় ভালো হয়, কোনো দিন রিকশা জমা দিয়ে খালি হাতেই ফিরতে হয়। এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে সুহেলীকে প্রতিদিন মেপে মেপে সংসারের হিসাব কষতে হয়।
সেদিন সুহেলীর বাজারের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৬০ টাকা। এই টাকা দিয়েই সাজাতে হবে সারা দিনের তিন বেলার আহার।
সুহেলী জানান, তিনি মোট ৩০ টাকার সবজি কিনেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১০ টাকার শিম, ১০ টাকার মুলা এবং ১০ টাকার টমেটো। প্রতিটি সবজিই তিনি বিক্রেতার কাছ থেকে ১০০ বা ২০০ গ্রাম করে মেপে নিয়েছেন। এরপর ১০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন দুই কেজি মোটা চাল। সংসারের প্রোটিনের জোগান দিতে ১০ টাকা দিয়ে কিনেছেন মাত্র ১০০ গ্রাম মোটা দানার মসুর ডাল। আর রান্নার জন্য নিয়েছেন ২০ টাকার খোলা সয়াবিন তেল।
১৬০ টাকার এই হিসাবটি ছোট কাগজের পাতায় খুবই সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু একজন সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এর ভেতরের মানসিক ও শারীরিক চাপটি পর্বতসম।