মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের মাস্টারমাইন্ড মো. আব্দুস সালাম খান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রিন্টিং প্রেসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন তিনি। ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় তিনি প্রশ্নফাঁসে কাজ করেছেন। পরীক্ষার আগে চক্রের প্রধান হোতা জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নুর কাছে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দিতেন তিনি। পরে জসিম তার চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে সেই প্রশ্ন সারা দেশে ছড়িয়ে দিতেন।
এভাবে সালামের দেওয়া প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে তারা হাতিয়ে নিতেন লাখ লাখ টাকা। আর অবৈধ অর্থ ব্যাংকে জমিয়ে হয়েছেন কোটিপতি।
রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার পাবলিক পরীক্ষা অপরাধ আইনের মামলার অভিযোগপত্রে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সম্প্রতি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোহাইমিনুল ইসলাম আদালতে এ অভিযোগপত্র দিয়েছেন। তদন্তে প্রশ্নফাঁস চক্রের ২৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মোহাইমিনুল ইসলাম জানালেন, আসামিরা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য। তারা পরস্পর যোগসাজসে ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরীক্ষার পূর্বে অবৈধভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রকাশ ও বন্টন করেছে। অবৈধ পন্থায় অর্থের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী শিক্ষার্থীদেরকে বিশেষ সুযোগ করে দিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আগামীর সময় বলেছেন, ফ্যাসিস্ট আমলে শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিতে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটত। কম মেধাবীরা প্রশ্ন কিনে চান্স পেত। অথচ মেধাবী হয়েও সুযোগ পেত না। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। আমরা দ্রুত সময়ে মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে চাই। একই সঙ্গে এই ঘটনায় যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটার জন্য আমরা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চাই।
প্রশ্নফাঁসের টাকায় কোটিপতি
জসিম উদ্দিন প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে সম্পদ অর্জন করেছে। তার নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র পাওয়া যায়। জসিম ৩৩টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ২৭ লাখ ৫০৭৬ জমা করেছে।
আসামি পারভেজ খান প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ উপার্জন করেছে। তার ৩৫টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৭৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা জমা করেছে। জাকির হাসান দিপুর আটটি ব্যাংক হিসাব ও এফডিআর পাওয়া যায়। এসব হিসাবে মোট ৫৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা জমা করেছে।
আলমগীর হোসেনের চারটি ব্যাংক হিসাবে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার টাকার তথ্য মিলেছে। ডা. সালেহীন শোভন কোচিং সেন্টার পরিচালনার আড়ালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস করতেন। তার সাতটি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৫০ লাখ ১৫ হাজার টাকা জমা করার তথ্য পাওয়া যায়।
শারমীন আরার ১৩টি ব্যাংক হিসাবে ২ কোটি ৮৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা জমা করার তথ্য পাওয়া যায়। মুহাম্মদ ময়েজ উদ্দিনের ৩৯টি ব্যাংকে হিসাবে ১৯ কোটি ১৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা জমা থাকার প্রমাণ মিলেছে। জীবিকা নির্বাহের কোনো পেশা না থাকলেও শাহজাদী আক্তারের ৪টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা জমা করার তথ্য পাওয়া যায়।
রওশন আলীর কোনো পেশা না থাকলেও তার ব্যাংক হিসাবে ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা করার তথ্য পাওয়া যায়। আসামি ইমরুল কায়েস হিমেল প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে তিনি বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করেন। তার নামে ১১টি ব্যাংক হিসাব ও ডিপিএস পাওয়া যায়। হিসাবগুলোয় মোট ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা জমা করার তথ্য পাওয়া যায়।
ইউনুচউজ্জামান খাঁন তারিম কোচিং সেন্টার পরিচালনার আড়ালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ফাঁসকৃত প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করতেন। তার ৩৫টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ৪৭ লাখ ২২ হাজার টাকা জমা করার তথ্য মিলেছে।
ছাত্র যোগাড় করতেন মোবাইল দোকানি
আসামি জসিম মেশিন ম্যান সালামের দেওয়া প্রশ্নপত্র তার ভাই মো. জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া মুক্তার, বোন শাহজাদী আক্তার, বোন জামাই জাকির হাসান দিপু, বন্ধু মো. পারভেজ খান ও সহযোগী এস এম সানোয়ার হোসেনের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের নিকট পৌঁছে দিতেন।
সানোয়ার হোসেনের ফার্মগেটের সেজান পয়েন্টে মোবাইল এক্সেসরিজের দোকান ছিল। জসিম উদ্দিন মোবাইল কিনতে এলে তার সঙ্গে সানোয়ারের পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষার পরে জসিম তাকে জানায়, সে যদি কিছু মেডিকেলে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী জোগাড় করে দিতে পারে। তাহলে প্রতি ছাত্র অনুযায়ী সে তাকে টাকা দেবে। জসিমের কথা মতো সানোয়ার কয়েকজন মেডিকেল ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থী জোগাড় করে জসিমকে জানান।
চান্স পেয়ে নিজেরা চক্রে জড়ান
২০০৫ সালে ডেন্টাল পরীক্ষার আগে জসিম মুক্তারকে জানায়, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন সে দিতে পারবে এবং তাকে কিছু ছাত্র জোগাড় করে দিতে বলেন। তিনি প্রশ্নফাঁস করে পরীক্ষা দিতে আগ্রহী পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করে এবং তাদের সঙ্গে বিভিন্ন অঙ্কের টাকার পরিমাণে চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী মোবাশ্বের ও আবু রায়হান নামে দুজন পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার আগের রাতে মুক্তার প্রশ্ন দেয় এবং ডা. জিল্লুর হাসান রনি প্রশ্নটি সমাধান করে দেন। পরীক্ষায় মোবাশ্বের ও আবু রায়হান ২ জনই চান্স পায়।
২০১৩ সালে জসিম আবার মুক্তারকে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন দেয়। মুক্তার প্রশ্ন ডা. আবু রায়হান ও ডা. জিল্লুর হাসান রনিকে সরবরাহ করেন। রনির ৬ জন পরীক্ষার্থী এবং আবু রায়হানের ৭ জন পরীক্ষার্থী চান্স পায়। তবে মুক্তার পরে জানতে পারে মিথ্যা বলে রনি অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ভর্তি করিয়েছে। ২০১৫ সালেও মুক্তার ডা. রনি ও রায়হানকে প্রশ্ন দেন। ২০১৭ সালে ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষার আগের রাতে মুক্তার আসামি পারভেজের মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে আবু রায়হানকে দেয়। আবু রায়হান একজন শিক্ষার্থী জোগাড় করে দিলে তিনি চান্স পায়।
২০১০ সালে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার আগেরদিন পরীক্ষার্থী সাইফুল আলম বাদশাকে তার বন্ধু ফয়সাল আহমেদ রাসেল ফোন করে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন দেবে বলে প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি হলে একই দিন সন্ধ্যার পর রাসেল দুটি গাড়িতে করে তিনিসহ আরও কিছু স্টুডেন্টকে নিয়ে রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের পাশে অবস্থিত একটা বাসায় যান। তাদেরকে ৬৫ টি প্রশ্ন এবং তার উত্তর সরবরাহ করলে তা পরীক্ষায় হুবুহু মিলে যায়। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম সারিতে চান পান।
পরে তিনিও তার বন্ধু ফয়সাল আহমেদ রাসেলের মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসে জড়িয়ে পড়েন। ২০১৫ সালে পরীক্ষার্থী হারুন ফাঁসকৃত প্রশ্নে রংপুর মেডিকেলে চান্স পান। ২০১৩ সালে শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলে চান্স পান। মো. ইব্রার আলম রংপুর মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী থাকাকালীন আসামি মো. জিল্লুর হাসান রনির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার মাধ্যমে তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
৫০ লাখ টাকায় প্রশ্ন কেনে থ্রি ডক্টরস কোচিং
২০১৫ সালে ফার্মগেটের ইউনিভার্সেল অ্যাডমিশনের জহির আহমেদ ফাঁসকৃত প্রশ্ন থ্রি ডক্টরস কোচিংয়ের পরিচালক বশির এবং তারিমের কাছে ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন ৷ ডা. সালেহীন শোভন ২০১৩ সালে ৩৫ জন ও ২০১৫ সালে ১০৯ জন শিক্ষার্থী জসিমকে দেন। ২০০৫ সালে আক্তাররুজ্জামান তুষার দুজন শিক্ষার্থী দিলে তারা ফাঁসকৃত প্রশ্নে চান্স পায়। ২০০৯ সালে প্রশ্ন না পেয়ে ইমরুল কায়েস বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হন। তবে তিনি ২০১৫ সালে তিনি জসিমকে পাঁচজন শিক্ষার্থী দিলে তারা চান্স পান।
২০১৫ সালে জহির উদ্দিন ১৫ জন পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করে দেন। ডা. রনি ২০০৬ সালে কিছু পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করে মুক্তারকে দেয় এবং তারা সবাই মেডিকেলে চান্স পায়। ২০১৩ সালের ভর্তি পরীক্ষায় জসিমের দেয়া প্রশ্নের ৩২টি পরীক্ষায় হুবহু মিলে যায়।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নু, এস এম সানোয়ার হোসেন, মো. পারভেজ খান, জাকির হাসান ওরফে জাকির হোসেন দিপু, মো. সামি উল জাফর ওরফে সিটু, জেডএমএ সালেহীন শোভন, আক্তারুজ্জামান খান তুষার, মো. আব্দুস সালাম খান, শারমিন আরা জেসমিন, মো. মোহাইমেনুল ইসলাম বাঁধন, মুহাম্মদ ময়েজ উদ্দিন আহমেদ প্রধান, শাহজাদী আক্তার মীরা, মো. জহিরুল ইসলাম ভুইয়া মুক্তার, মো. রওশন আলী, মো. আবু রায়হান, ইমরুল কায়েস হিমেল, মো. জিল্লুর হাসান ওরফে রনি, মো. জহির উদ্দিন আহম্মেদ বাপ্পি, মো. ইউনুচ উজ্জামান খান, লুইস সৌরভ সরকার, মো. ইব্রার আলম, সাইফুল আলম বাদশা, মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. আলমাস হোসেন শেখ, ফয়সাল আহমেদ রাসেল, বকুল রায় শ্রাবণ, মো. রায়হানুল ইসলাম সোহান, মো. আবদুল হাফিজ হাপ্পু ও তৌফিকুল হাসান।
২১ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ
কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় আসামি রাশেদ খান মেনন, রেদওয়ানুর রহমান শোভন, মো. ইমন খান, মনিরুল ইসলাম খান মুবিন, মো. সাজরাতুল ইয়াকিন রানা, সোহেলী জামান, জোবাইদুর রহমান জনি, আব্দুল কুদ্দুস সরকার, মুসতাছিন হাসান লামিয়া, নাজিয়া মেহজাবিন তিশা, শর্মিষ্ঠ মন্ডল, মাকসুদা আক্তার মালা, কে এম বশিরুল হক, জাকিয়া ফারইভা, অনিমেষ কুমার কুণ্ডু, জাকারিয়া আশরাফ, সাবরিনা নুসরাত রেজা, মৈত্রী সাহা, সোহানুর রহমান সোহান এবং মৃত্যুবরণ করায় মো. আলমগীর হোসেন ও কাওছার আহম্মেদকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
২০২০ সালের ২০ জুলাই সিআইডির উপপরিদর্শক প্রশান্ত কুমার সিকদার বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় পাবলিক পরীক্ষা অপরাধ আইনে মামলা করেন।