শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র কিলোমিটার ছয়েক দূরের সবুজে ঘেরা এক জনপদ—বিলাসের পাড় গ্রাম। গ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে ‘বিলাসছড়া’ নামের একটি পাহাড়ি খাল, যার নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ। নামে বিলাসছড়া হলেও বর্ষা এলে এটি প্রমত্তা নদীর রূপ ধারণ করে। আর এই ছড়াটিই সুদৃশ্য গ্রামটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। খালের এক পাশে স্কুল, মসজিদ, মন্দির আর বসতবাড়ি; অন্য পাশে কৃষকের ফসলি জমি। প্রকৃতির এমন বৈরিতার মাঝে বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে গ্রামের প্রায় ছয় শত মানুষের ভাগ্য। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এই খালের ওপর নির্মিত হয়নি কোনো পাকা সেতু। গ্রামবাসীদের নিজেদের চাঁদা ও স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই এখন দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয়দের আক্ষেপ—দেশে সরকার বদলেছে, জনপ্রতিনিধি বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি কেবল তাদের ভাগ্য। প্রতি নির্বাচনের আগেই আসে সেতু নির্মাণের একঝাঁক প্রতিশ্রুতি, তবে ভোট ফুরোলেই সব ঢাকা পড়ে উপেক্ষার চাদরে। বুকভরা কষ্ট নিয়ে এক গ্রামবাসী প্রশ্ন তোলেন, 'স্বাধীনতার এত বছর পরও আমাদের চলাচলের একমাত্র ভরসা এই নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো। তাহলে দেশের উন্নয়ন কি আমাদের এই সাঁকোর মতোই নড়বড়ে?'
প্রতিদিন স্কুলপড়ুয়া শিশু, কৃষক, বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পার হচ্ছেন। বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অতিবৃষ্টি বা ঝড়ে সাঁকোটি ভেঙে গেলে পুরো গ্রাম বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাঁকোর পাশে দাঁড়িয়ে একাকী অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া সন্তান স্কুল থেকে ফিরলে তাকে হাত ধরে সাঁকো পার করিয়ে দেবেন।
চোখে-মুখে উদ্বেগের ছাপ নিয়ে আনোয়ারা বেগম বললেন, 'দিনের আলোয় একরকম কেটে যায়, কিন্তু রাতে কেউ অসুস্থ হলে আতঙ্কে আমাদের বুক কাঁপে। হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উপায় থাকে না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের কষ্টের শেষ থাকে না। বর্ষার সময় মনে হয় আমরা বাংলাদেশে নেই, বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে আছি।'
এই খালের ওপর একটি সেতুর অভাব কতটা তীব্র, তা ফুটে ওঠে গত ৬ মে’র একটি ঘটনায়। সেদিন গ্রামের বাসিন্দা নাজিম উল্লাহ মারা যান। কিন্তু খালের ওপাড়ে জানাজার মাঠে নেওয়ার মতো কোনো সেতু না থাকায়, বাধ্য হয়ে তাঁর মরদেহ নৌকায় করে ওপাড়ে নিয়ে যেতে হয়। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতেও স্বজনদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। নিহতের মেয়ে হাজেরা বেগম কান্নাভেজা কণ্ঠে জানালেন, 'একটা ব্রিজের অভাবে আমার বাবার মরা লাশ নৌকায় করে জানাজায় নিতে হয়েছে। এমন কষ্ট যেন আর কোনো পরিবারকে পেতে না হয়।'
শিক্ষার আলো ছড়ানোর ক্ষেত্রেও এই ছড়াটি এখন এক বড় দেয়াল। বিলাসের পাড় ছবুরা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হক জানালেন, 'দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকাটি চরম অবহেলিত। সেতুর অভাবে কোমলমতি শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসে। বর্ষার দিনে অনেকে স্কুলেই আসতে পারে না, ফলে তাদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।'
অবশ্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাগজে-কলমে তৎপরতার কমতি নেই। আশিদ্রোন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রনেন্দ্র প্রসাদ বর্ধন জহর জানান, স্থায়ী একটি সেতুর জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী এলাকাটি পরিদর্শন করে গেছেন। তিনি আশা করছেন, দ্রুতই এর একটি স্থায়ী সমাধান হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুর রাকিবও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন, 'সেখানে একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।'
এদিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, 'এটি এলজিইডির আওতাধীন একটি প্রকল্প। সেখানে ১০০ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণের জন্য তালিকাভুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওপর থেকে অনুমোদন এলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।'