Image description

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক জোরপূর্বক পুশইনের শিকার হওয়া ২৮ জন মানুষের জীবন এখন চরম সংকটে পড়েছে। বুধবার (৩ জুন) মধ্যরাত থেকে পরের দিন পেরিয়ে রাত নেমে এলেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্য রেখায় খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তারা।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উদ্যোগে দুই দফা পতাকা বৈঠক হলেও বিএসএফের অনড় অবস্থানের কারণে কোনো সমাধান মেলেনি। আটকে পড়াদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও ১০ জন নারীর পাশাপাশি ৬টি শিশু রয়েছে। তারা তীব্র বৈরী আবহাওয়ায় মানবেতর দিন কাটিয়েছে। ১৬ বিজিবি নওগাঁ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকার কাছ দিয়ে এই ২৮ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন ভারতের ১২ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর ক্যাম্পের সদস্যরা। তবে বাঙ্গাবাড়ী বিওপির বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বিএসএফের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

 

বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পেরে শূন্যরেখায় আটকা পড়েন। বৃহস্পতিবার দিনভর কখনো তীব্র রোদ, আবার কখনো ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়তে হয়েছে এই দলটিকে। খোলা আকাশের নিচে কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।

 

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহমান বলেন, ভোরবেলা থেকেই আমরা সীমান্ত এলাকার এই মানুষগুলোকে দেখছি। সারা দিন রোদের পর বিকেলে যখন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো, তখন ছোট ছোট বাচ্চা আর নারীরা আশ্রয় খুঁজছিল। খোলা মাঠে প্লাস্টিক বা ছাউনি দেওয়ার মতো কোনো জিনিসও তাদের কাছে নেই। এই বৃষ্টির মধ্যে তারা যেভাবে ভিজে ভিজে কাঁপছে, তা সত্যি এক বড় মানবিক বিপর্যয়।

 

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, বিএসএফ মানুষগুলোকে আমাদের দেশের দিকে ঠেলে দিয়ে জিরো লাইনে আটকে রেখেছে। ছোট বাচ্চাগুলো ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে। তাদের দ্রুত সুরাহা হওয়া দরকার, না হলে রাতের অন্ধকারে এরা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে।

 

সীমান্তের এই জটিল পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট নিরসনে দিনভর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা চলে। বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘জিরো লাইনে আটকে পড়াদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে প্রথমে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে এবং পরবর্তীতে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে দুটি ফ্ল্যাগ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিএসএফ তাদের পুশইনের সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড় থাকায় কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই দুটি বৈঠকই শেষ হয়।’

 

সীমান্ত এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে বিএসএফ অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করেছে এবং বিভিন্ন পোস্টে অবস্থান নিয়েছে। এর জবাবে বিজিবির পক্ষ থেকেও সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে নজরদারি ও টহল কয়েক গুণ জোরদার করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সারিকুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, ভোররাতেই বিজিবির পক্ষ থেকে তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সীমান্তের পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। বিজিবি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

 

তিনি বলেন, জিরো লাইনে আটকে পড়া ২৮ জন ব্যক্তিকে পুনরায় ভারতীয় ভূখণ্ডেই ফেরত পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বর্তমানে সীমান্তের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিজিবি।