Image description

মাত্র ১৭০ টাকা। অবিশ্বাস্য শোনালেও এই সামান্য টাকার বিনিময়ে অনলাইনে মিলছে জাতীয় পরিচয়পত্র। একজনের এনআইডি নিতে পারছেন আরেকজন। মাত্র ৫০ টাকা দিলে এক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো এলাকার ভোটার তালিকাও পাওয়া যায়। দুইদিনে অতি জটিল এনআইডি সংশোধনও করা যায়। এমনকি টাকার বিনিময়ে যেকোনো ব্যক্তির সিমকার্ড, পাসপোর্ট নম্বর, লাইভ লোকেশনও সরবরাহ করছে একটি চক্র। এমন শত শত বিজ্ঞাপন ফেসবুকে ঘুরছে। টাকা দিলে মিলছে সংবেদনশীল ফিঙ্গারপ্রিন্টও।

প্রশ্ন উঠছে দেশের কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য কী এখন আর সুরক্ষিত নয়? আর এত স্পর্শকাতর তথ্য কীভাবে চুরি হয়। এবং এনআইডি সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শুধুমাত্র ফেসবুকে নয়, বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, অ্যাপ, মেসেজিং চ্যানেল ও অননুমোদিত ডাটাবেজে মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, জন্ম তারিখসহ সংবেদনশীল তৃতীয় ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়ার অফার দেয়া হচ্ছে। এতে প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনআইডি এখন শুধু আর ভোটার পরিচয় নয়, এটা ব্যাংক হিসাব, মোবাইল সিম, পাসপোর্ট, জমি নিবন্ধন ও গাড়ি নিবন্ধন থেকে শুরু করে অসংখ্য সেবার কেন্দ্রবিন্দু জুড়ে রয়েছে। ফলে এই তথ্য ফাঁস হওয়া মানে একজন নাগরিকের ব্যাংক থেকে কোটি টাকা উধাও হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বেহাত হওয়ায় অতি সম্প্রতি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে অচেনা নম্বর থেকে ফোন, প্রতারণামূলক বার্তা ও বিভিন্ন আর্থিক প্রলোভনের ঘটনা বাড়ছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, তাদের তথ্য কীভাবে বিভিন্ন পক্ষের হাতে পৌঁছেছে সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই। এনআইডি তথ্য ফাঁস হলে পরিচয় চুরি, আর্থিক প্রতারণা, ভুয়া সিম নিবন্ধন ও ডিজিটাল জালিয়াতির ঝুঁকি রয়েছে। সম্প্রতি অজ্ঞাত নম্বর থেকে মেসেজে এসে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

এক মহিলার এনআইডি দিয়ে ২ হাজার খাজনা পরিশোধ: পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার প্রত্যন্ত সাতখামার গ্রামের বেবী বেগম। জীবদ্দশায় কখনো ঢাকা আসেননি। নেই কোনো ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টও। কিন্তু তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ঢাকাসহ সারা দেশের দেড় শতাধিক ভূমি অফিসে অন্তত ২ হাজার ব্যক্তি জমির ডিজিটাল খাজনা পরিশোধ করেছেন। কোনো কোনো ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা বেবীর এনআইডি দিয়ে মাসে শতাধিক খাজনা পরিশোধ করেছেন এমন তথ্যও পাওয়া গেছে।

দেশের এমন কোনো জেলা নেই, যেখানে তার নামে জমির খাজনা দেয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব ব্যক্তি অনলাইন প্ল্যাটফরম থেকে নিজের সম্পদের হিসাব আড়াল করতে চান তারাই বেনামি জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে জমির কর পরিশোধ করছেন। মূলত তাদের কাজেই বেবী বেগমের এনআইডি’র গোপনীয় তথ্য ব্যবহার হচ্ছে। এমনকি বেবী বেগমের এনআইডি’র বিপরীতে একাধিক সিমকার্ড সচল রাখা হয়েছে। এবং ব্যাংক, বিকাশ, নগদ হিসাব খুলেও তা ব্যবহার করছে একটি চক্র। অথচ বেবী বেগম এইসব ঘটনার কিছুই জানেনই না।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, টাকার বিনিময়ে কিছু চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনআইডি তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে সেটার তদন্ত করা হয়েছে। কিছু প্রমাণ পাওয়ার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শোকজও করা হয়। অনেকের এক্সেসও প্রত্যাহার করা হয়। তবুও প্রতারণা থামানো যাচ্ছে না।

অধিক ব্যবহৃত একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে দেখা গেছে, একটি চক্র অনলাইন গ্রাহক ধরতে ফেসবুকে পোস্ট করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মসনদ সংক্রান্ত সকল সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এমনকি কোন সেবা নিতে কতো টাকা দিতে হবে তাও উল্লেখ করে দিচ্ছেন। নিজের ফোন নম্বর দিয়ে কেউ আগ্রহ থাকলে ওই চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলছেন। এমন একাধিক পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ফেসবুকে ‘এনআইডি কার্ড অনলাইন সার্ভিস, এনআইডি কার্ড সংশোধন, অনলাইন এনআইডি ও জন্মনিবন্ধন সেবা, হারানো এনআইডি পুনরুদ্ধার, এনআইডি কার্ড হেল্পলাইন, এনআইডি সমস্যা সমাধান’ এমন অসংখ্য ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্ট দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সকল সেবা দেয়ার অফার করছেন। এসব পেজ ও গ্রুপে শত শত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের সাইন কপি ঘুরছে। এসব কাগজ দেখিয়ে অন্যদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ফাঁস হওয়া এনআইডিতে ব্যক্তির ফোন নম্বর, পাসপোর্ট ও পরিবারের তথ্যও রয়েছে। চক্রটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বয়স সংশোধন সংক্রান্ত জটিল কাজও অল্প সময়ে করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এমনকি অতি সংবেদনশীল সিম কার্ডের বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্টের তথ্যও সরবরাহ করেন চক্রটি। ভুয়া এনআইডি কার্ড বানিয়ে তা সার্ভারে এড করিয়ে দিতেও লোভনীয় অফার ফেসবুকে ঘুরছে।

এ বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল নোমান মানবজমিনকে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, তৃতীয় পক্ষের কাছে তথ্য প্রবাহ এবং অপর্যাপ্ত সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। আবার অনেক সময় নাগরিকরা না জেনেই বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করে। এতে সমস্যার মাত্রা আরও বাড়ে। এনআইডি নম্বর, ওটিপি, ব্যাংকিং তথ্য বা ব্যক্তিগত কাগজপত্র অচেনা ব্যক্তি বা অনিরাপদ প্ল্যাটফরমে শেয়ার করা উচিত নয়। পাশাপাশি শক্তিশালী ডাটা সুরক্ষা আইন, নিয়মিত সাইবার অডিট ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। এনআইডি তথ্য ফাঁস মানে শুধু একটি নম্বর হারানো নয়। এই তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় চুরি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা, সিম নিবন্ধন, আর্থিক প্রতারণা এমনকি ডিজিটাল জালিয়াতির মতো অপরাধ ঘটতে পারে।

২০২৩ সালে বাংলাদেশের একটি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে কোটি কোটি নাগরিকের তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনা দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তথ্য চুরি হওয়ার পর তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়া হয়। সেখানে ব্যক্তির নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ও এনআইডি তথ্য ছিল। তখন বিপুলসংখ্যক নাগরিকের তথ্য ঝুঁকিতে পড়ে। পরে সরকারি পক্ষ জানায়, এটি হ্যাকিং নয়; ওয়েবসাইটের প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে ঘটেছিল।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ মানবজমিনকে বলেন, এনআইডি তথ্য বাইরে পাওয়া যাচ্ছে, আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।