Image description

প্রতি বছর বাজেটে করহার ও করমুক্ত আয়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন করদাতারা। তবে আসন্ন বাজেটে কর  ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। এর অংশ হিসেবে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ নেয়াা হচ্ছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে। আগামী ১১ই জুন জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ব্যক্তি করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা, করহার এবং কর কাঠামো সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া হতে পারে।

এনবিআর সূত্র বলছে, এই পরিকল্পনার আওতায় বর্তমান ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হবে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়সীমা এক লাখ টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এটি হবে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা বা ‘ট্যাক্স রোডম্যাপ’।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এর মাধ্যমে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীরা আগাম জানতে পারবেন ভবিষ্যতে তাদের কর দায় কতোটা বাড়তে বা কমতে পারে। ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে।

এদিকে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র মতো উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, ভর্তুকি কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছে। ফলে আসছে বাজেটে এসব চাপ থাকতে পারে বলে জানা গেছে।

কোন বছরে করমুক্ত আয় কতো হবে?: বর্তমানে একজন ব্যক্তি বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করলে আয়কর দিতে হয় না। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে এই সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা: ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২৭-২৮ অর্থবছর: ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা, ২০২৯-৩০ অর্থবছর: ৪ লাখ টাকা, ২০৩০-৩১ অর্থবছর: ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় রেখে সাধারণ করদাতাদের কিছুটা স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

যে কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: বাংলাদেশে এতদিন করনীতি মূলত এক বছরের জন্য নির্ধারণ করা হতো। প্রতি বাজেটের আগে করমুক্ত আয়সীমা বাড়বে কিনা, করহার পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা নতুন কোনো কর আরোপ করা হবে কিনা- তা নিয়ে করদাতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এখন কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব করতে চায়। সেই লক্ষ্য থেকেই দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৪ই মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ পরিকল্পনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার প্রথম বাজেটেই এই রোডম্যাপ তুলে ধরতে পারেন।

কর বিশেষজ্ঞরা জানান, নতুন পরিকল্পনার ফলে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের করদাতারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে যাদের বার্ষিক আয় করমুক্ত সীমার কাছাকাছি, তারা কিছুটা কর সাশ্রয়ের সুযোগ পাবেন। চাকরিজীবীরাও ভবিষ্যৎ আয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে কর কাঠামো সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাবেন।

বর্তমানে দেশে এক কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাদের মধ্যে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রিটার্ন দাখিল করেন প্রায় ৪৬ লাখ করদাতা। করদাতাকে রিটার্ন দেয়ার সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করতে হয়।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?: করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে অনেকের প্রশ্ন- এই বৃদ্ধি কি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাংলাদেশে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৪ শতাংশ। এই অবস্থায় অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার চেয়ে ৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি করা প্রয়োজন ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণার বিষয়টি এনবিআরের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সরকার ইতিমধ্যে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে করনীতি নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সবমিলিয়ে করদাতাদের জন্য সরকারের এই নতুন ‘মাস্টারপ্ল্যান’ কর ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত রোডম্যাপ বাস্তব জীবনে সাধারণ মানুষের করের চাপ কতোটা কমাতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে কতোটা সুরক্ষা দিতে সক্ষম হয়।

আগামী ১১ই জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে করের হার না বাড়িয়ে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের দিকে জোর দেয়া হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। একদিকে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করছে। অপরদিকে, রাজস্ব আদায়ের চাপ মোকাবিলায় ভ্যাট ও করের জালও বিস্তৃত করছে। ফলে আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- রাজস্ব আহরণের প্রয়োজনীয়তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সরকার কতোটা ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক। তাই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে খুব বেশি লাভ হবে না। কারণ মূল্যস্ফীতি কমে এলে তখন করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দরকার হবে না।

এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সবচেয়ে আলোচিত নীতিগত এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র মতো উন্নয়ন সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, ভর্তুকি কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছে। দেশীয় অর্থনীতিবিদদের বড় অংশেরও এতে সায় রয়েছে। ফলে সরকারও বাজেট ও নীতি পদক্ষেপে সেই সংস্কারের প্রতিফলন রাখার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় সংস্কার চাপের মুখে ব্যাংক খাত। রাজস্ব খাতেও সংস্কারের চাপ বাড়ছে।

আইএমএফের বিদ্যমান কর্মসূচি বাতিল হলেও নতুন সমঝোতা কাঠামোর আলোচনায় যেমন রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ভর্তুকি যৌক্তিক করার শর্ত বহাল থাকছে, তেমনি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সংস্কার-সম্পৃক্ত শর্তও বহাল রয়েছে। ফলে নতুন বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসঙ্গতি সংশোধনের একটি রূপরেখা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসায়ীরা সংস্কারের বিপক্ষে নয়। কিন্তু নীতির ধারাবাহিকতা, পূর্বানুমান যোগ্যতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।