শরীয়তপুরের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রঙিন পাকা বাড়িগুলো ইতালিপ্রবাসীদের সাফল্যের গল্প বলে। সেই গল্পই তরুণদের টেনে নেয় ইউরোপের স্বপ্নে। কিন্তু লিবিয়া-ইতালি রুটে পা রাখার পর অনেকের ভাগ্যে জোটে দালালের প্রতারণা, মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতন, কারাগারের অমানবিক জীবন আর ভূমধ্যসাগরের মৃত্যু-ফাঁদ।
ভালো জীবনের আশায় লিবিয়া হয়ে ইতালির পথে পা বাড়ান বাংলাদেশের অনেক তরুণ। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথই অনেকের জন্য পরিণত হয় নির্যাতন, মুক্তিপণ, বন্দিজীবন আর মৃত্যুভয়ের বিভীষিকায়। যারা বেঁচে দেশে ফেরেন, তাদের জীবনও সহজ হয় না। ঋণের বোঝা, মানসিক ট্রমা আর সামাজিক একাকীত্ব নিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার পশ্চিম কোটাপাড়ার বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী খবির হোসেন খানও এমনই এক স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। দুই সন্তানের এই বাবা আগে একটি দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। অল্প আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে।
খবির বলেন, এক দালাল বলেছিল, লিবিয়া হয়ে ইতালি গেলে ভালো আয় করা যাবে। সে বলেছিল পথটা নিরাপদ।
সহজ চুক্তি ছিল, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর চার লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নেওয়া হবে তাকে।
২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর দেশ ছাড়েন খবির। ঢাকা থেকে দুবাই, সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান তিনি। বেনগাজিতে পৌঁছানোর পর এক বাংলাভাষী দালাল তাকে নিয়ে যান উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্দরনগরী তোব্রুকে। এরপরই শুরু হয় বন্দিজীবন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে নেওয়া হয় অভিবাসীদের ভাষায় একটি ‘গেম হাউজে’। সেখানে ইতালির উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রার আগে অভিবাসীদের আটকে রাখা হয়।
খবির বলেন, রুমে কোনো ফ্যান ছিল না। খাবারেরও তীব্র সংকট ছিল। কখনো কখনো কাঁচা নুডুলস খেয়ে থাকতে হয়েছে। প্রহরীরা মোটা দড়ি আর প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে মারধর করত।
একপর্যায়ে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে অভিবাসীদের অপহরণ করে। কবিরের পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। স্বজনেরা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সেই টাকা জোগাড় করেন। তবু মুক্তি মেলেনি কবিরের।
পরে লিবিয়ার পুলিশ অভিযান চালিয়ে খবিরসহ অন্যদের আটক করে। বেনগাজির ডিটেনশন সেন্টারে চার মাসের বেশি সময় কাটাতে হয় তাকে।
খবির বলেন, এত মানুষ গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল যে ঠিকমতো হাত-পাও নাড়ানো যেত না। বেশিরভাগ দিন একবেলা খাবার দেওয়া হতো, কোনো কোনো দিন দুই বেলা। পরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দেশে ফেরেন তিনি।
তবে দেশে ফিরে অপেক্ষা করছিল আরেক দুঃসহ বাস্তবতা। এখন তার মাথায় প্রায় ১৮ লাখ টাকার ঋণের বোঝা। এর কিছু এনজিও থেকে, বাকিটা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে নেওয়া।
সংসার চালানো ও ঋণ শোধের জন্য এখন তিনি একটি চায়ের দোকান ও ছোট লন্ড্রি চালাচ্ছেন। খবির বলেন, এখন আমার একটাই চিন্তা, সন্তানদের মানুষ করা আর ঋণ শোধ করা।
পাশের দক্ষিণ ভাষানচর গ্রামের ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আরিফ ব্যাপারীর অভিজ্ঞতাও একই রকম ভয়াবহ।
২০২০ সালে বৈধভাবে হাঙ্গেরি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ভিসা না পাওয়ায় দালালরা তাকে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। বলা হয়, মাত্র ১০ দিনে ইতালিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। খরচ ধরা হয় ১৩ লাখ টাকা।
এই টাকা জোগাড় করতে পরিবারের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। আত্মীয়দের কাছ থেকেও ঋণ নিতে হয়।
২০২৪ সালের ১৮ মার্চ ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে মিশর পেরিয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান আরিফ। ত্রিপোলিতে প্রায় তিন মাস একটি ‘গেম হাউজে’ কাটান তিনি।
আরিফ বলেন, কারও পরিবার টাকা পাঠাতে দেরি করলেই পাচারকারীরা তাকে আলাদা রুমে নিয়ে নির্যাতন করতো।
২০২৪ সালের ঈদুল আজহার রাতে পাচারকারীরা ৫০ জন অভিবাসীকে ৩০ জন ধারণক্ষমতার একটি নৌকায় তোলে। যাত্রীদের বেশিরভাগই ছিলেন বাংলাদেশি।
সমুদ্রে রওনা দেওয়ার প্রায় ৯০ মিনিটের মাথায় নৌকাটি ডুবে যায়। আরিফ প্রথমে একটি তেলের ড্রাম ধরে ভেসে থাকেন। পরে আরেক বাংলাদেশি তাকে একটি ফোলানো বালিশ দেন। প্রায় সাত ঘণ্টা সাগরে ভেসে থেকে তিনি সাঁতরে লিবিয়ার উপকূলে ফিরে আসেন।
আরিফ বলেন, অনেকেই সাগরে নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে জীবিতদের আটক করে জেলে পাঠায় লিবিয়ার পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদস্যরা প্রায়ই মারধর করত। দুই মাসের বেশি সময় নির্যাতন ও অনাহারের মধ্যে কাটানোর পর আইওএমের সহায়তায় ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে ফেরেন আরিফ।
দেশে ফিরে তীব্র মানসিক ট্রমায় ভুগতে থাকেন আরিফ। পরে তাকে কাউন্সেলিং নিতে হয়। এখন একটি ফার্মেসিতে কাজ করছেন তিনি।
আরিফ বলেন, আমি সবাইকে বলি এই পথে না যেতে। কিন্তু তারপরও মানুষ যাচ্ছে।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিসহ ৩১ হাজারের বেশি অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর বড় একটি অংশ লিবিয়া-ইতালি রুটে।
নির্যাতন, মৃত্যু আর নিখোঁজ হওয়ার খবর নিয়মিত প্রকাশ পেলেও শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের অনেক তরুণ এখনো এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। সন্ধ্যা নামলে গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে এখনো বসে ইতালি যাওয়ার পথের গল্প।