Image description

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ

গত ৯ মে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান সাঈদ মহসিন রাজানাকভি ঢাকায় দুই দিনের সফরে আসেন। তার এই সফরটি বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজের সময় হলেও এটি শুধু ক্রীড়াকেন্দ্রিক ছিল না। এর সঙ্গে স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তাও যুক্ত ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত জটিল ও আবেগপ্রবণ।

 

রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা— ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালিদের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার স্মৃতি— দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্ককে শীতল করে রেখেছে।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক উষ্ণতার সূচনা দেখা যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই পাকিস্তানের একাধিক মন্ত্রী, বিশেষ করে দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকা সফর করেন। এ ছাড়া পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফেরও চলতি মাসে ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পরই শেহবাজ শরিফ ঢাকায় আসতে পারেন।

এসব সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি এখনো থেকেই যায়— বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা কি একটি নতুন সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি কেবলই কৌশলগত প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়া এক ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা?

ইতিহাসের ভার ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তবতা
পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের ওপর চালানো গণহত্যা এবং নারীদের ওপর চালানো নৃশংসতার স্মৃতি বাংলাদেশের জনগণের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যেকোনো উদ্যোগই জনমতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়শই নিজেদের স্বার্থে এই ইতিহাসকে কাজে লাগিয়েছে, যার ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল শীতল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার ও দণ্ডাদেশকে কেন্দ্র করে। এসব নেতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
পাকিস্তান একাধিকবার এসব বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিল, যা দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

তবে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানের মন্ত্রী ও সামরিক কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর বৃদ্ধি পায় এবং দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবুও ঐতিহাসিক বোঝা এখনো অমীমাংসিত।
পাকিস্তান এখনো ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি। বাংলাদেশের জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, পাকিস্তান তার দোষ স্বীকার না করলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব।

ফলে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও দুই দেশের মধ্যে মানসিক দূরত্ব এখনও রয়ে গেছে। অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতায় আবেগের পাশাপাশি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি পাকিস্তানকে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে সব আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। তবে এই সম্পর্ক উন্নয়নকে এমনভাবে ভারসাম্য রাখতে হবে যাতে ভারতের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত না হয়।

ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন সমীকরণ
নাকভির সাম্প্রতিক ঢাকা সফরে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল নিরাপত্তা সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। এর আওতায় মাদক চোরাচালান, অর্থপাচার এবং সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময় করবে।

তবে প্রশ্ন হলো, যেহেতু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো স্থল সীমান্ত নেই, এই সহযোগিতা কতটা কার্যকর হবে? চুক্তিগুলোকে মূলত একটি কূটনৈতিক প্রদর্শনবলেই মনে হচ্ছে, নিরাপত্তার ওপর যার বাস্তব প্রভাব নগণ্য।
এ ছাড়া পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, উগ্রপন্থী সংগঠনের বিস্তার এবং আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা— এসব বিষয় দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ফলে এমন একটি দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে এবং আফগানিস্তান ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

পাকিস্তান প্রায়ই আঞ্চলিক সংকটকে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক সম্পর্ক উন্নয়নের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা। ঢাকা চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভারতের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। ভারত বাংলাদেশকে তিন দিক থেকে ঘিরে রাখা একটি দেশ।

এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান উষ্ণ সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক আস্থার চেয়ে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফল।

নতুন সম্ভাবনা নাকি কূটনৈতিক মরীচিকা?
শুধু ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা না চাওয়াই নয়, বাংলাদেশের পাওনা সম্পদ সম্পর্কিত ইস্যুও এখনো অমীমাংসিত। এসব বিষয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
এ ছাড়া বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা পূরণের মতো শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবকাঠামো পাকিস্তানের নেই। ফলে ভারতকে বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা সহজ হবে না। তবুও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ওষুধ ও কৃষি খাতে সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।
পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কমাতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশও প্রচলিত অংশীদারদের বাইরে নতুন রপ্তানি বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। এই অর্থনৈতিক স্বার্থের মিলনই দুই দেশকে কাছাকাছি আনছে।

মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়লে পারস্পরিক অবিশ্বাস কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।
যদি সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক সফর ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা টেকসই হবে না। একইভাবে পাকিস্তান যদি ১৯৭১ সালের ইতিহাস বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস দূর করা কঠিন হবে।