অল্প সময়ে অনেক লাভের আশায় জমানো সঞ্চয়ের পুরোটাই লগ্নি করেছিলেন ‘গ্লোবাল ক্রিপ্টো ইনভেস্ট’ নামের একটি সাইটে। কিন্তু মাত্র তিন দিনের মাথায় উধাও ওয়েবসাইট। সঙ্গে মুছে ফেলা হয়েছে টেলিগ্রাম গ্রুপও। প্রতারণার শিকার হওয়ার পর এভাবে নিজের জীবনের গল্প শোনালেন তরুণ উদ্যোক্তা জমির উদ্দিন। শুধু জমির নন, চট্টগ্রামসহ পুরো দেশে অভিন্ন কায়দায় প্রতিদিন শত শত মানুষ নিঃস্ব হচ্ছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রার ফাঁদে পড়ে। নেট দুনিয়ায় প্রতারণার জাল বিছিয়েছে দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র নিঃস্ব করছে মানুষকে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভার্চুয়াল ডাকাতির চাঞ্চল্যকর তথ্য। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ-সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত সাইবার ক্রাইমের নানা ধরনের অভিযোগ পাচ্ছি।
তার মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা আর্থিক প্রতারণার ঘটনাও রয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এ ধরনের অপরাধ রোধে দ্রুত সময়ের মধ্যেই সাইবার সাপোর্ট সেন্টার চালু করছে সিএমপি।’ প্রযুক্তিবিদ ড. ফয়সাল কামাল চৌধুরী বলেন, দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির আইনি বৈধতা বাংলাদেশে না থাকায় প্রতারণার শিকার হয়েও অনেকে যথাযথ আইনি সহায়তা নিতে পারছে না। একবার অর্থ হাতছাড়া হলে আইনি প্রক্রিয়ায় তা উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। আন্তর্জাতিক চক্রগুলো যে ভয়ংকর ডিজিটাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, তা ভাঙতে প্রয়োজন কঠোর সাইবার নজরদারি এবং ব্যাপক মাত্রায় জনসচেতনতা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নেট দুনিয়ার প্রতারণার জাল বিছিয়ে চলছে ‘ভার্চুয়াল ডাকাতি’। এ ডাকাতির জন্য সাইবার অপরাধীদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র হলো সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ডিসকর্ড-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে হাজার হাজার ভুয়া ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ তৈরি করে নিঃস্ব করছে সাধারণ লোকজনকে। এ ছাড়া টিন্ডার বা বাম্বলের মতো ডেটিং অ্যাপগুলোকেও ফাঁদ পাতার প্রাথমিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে স্ক্যামাররা। তারা ভুয়া অ্যাপ তৈরি করে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল স্টোরেও আপলোড করে রাখে, যা দেখতে হুবহু আসল ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের মতো। ভয়ংকর প্রতারণার নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত সুসংগঠিত দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। এ নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস এবং ফিলিপাইনের দুর্গম এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ডে’ বসে। কিংবা বাংলাদেশের কোনো বাসার রুমে। তাদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে যারা অল্প সময়ের মধ্যে বেশি টাকা আয় করতে চান এমন শ্রেণির মানুষ। যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষিত বেকার ও তরুণ সমাজ, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী। সিন্ডিকেটগুলো ক্রিপ্টো প্রতারণার ক্ষেত্রে ‘পিগ বুচারিং’ বা শূকর মোটাতাজাকরণ অনুসরণ করে।
ঠিক যেভাবে একটি প্রাণীকে জবাই করার আগে খাইয়ে বড় করা হয়। প্রতারকরাও ভুক্তভোগীর সঙ্গে ঠিক একই কাজ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশলের মাধ্যমে নতুন ভুয়া কয়েনের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। পরে চড়া দামে নিজেদের হোল্ডিং বিক্রি করে চক্রটি উধাও হয়ে যায়। এ ছাড়া ফিশিং লিংক পাঠিয়ে সরাসরি মেটামাস্ক বা ট্রাস্ট ওয়ালেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। টার্গেটকে ফাঁদে ফেলে লুটে নেওয়া পর ডিজিটাল মুদ্রাগুলো ‘ক্রিপ্টো মিক্সার’ সার্ভিসের মাধ্যমে শত শত অজ্ঞাত ওয়ালেটে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর পিয়ার-টু-পিয়ার (পিটুপি) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে ডলারে বা স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশে দেশি এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিং বা হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এ টাকা সংগ্রহ করে।