Image description

আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতায় এর আগের বাজেট বরাদ্দের বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে গেছে। তাই বাজেট বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে আমরা চেষ্টা করছি।’ নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ এবং শিক্ষা খাতের পর এটিই তৃতীয় সর্বোচ্চ খাতভিত্তিক বরাদ্দ। স্বাস্থ্য খাতের মোট ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পাবে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ পাবে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। বাকি ৫০৩ কোটি টাকা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় হবে। আগামী ১১ জুন বিএনপি সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এর আগে গত ১৯ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেয়।

স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে গত কয়েক বছর ধরেই চলছে শুভঙ্করের ফাঁকি। জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্ক ফাউন্ডেশনের স্বাস্থ্য বাজেট ও জনবলসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি অর্থবছরেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মূল বাজেট সংশোধিত বাজেটে এসে বড় আকারে কমে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য প্রথমে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৯২৫ কোটি টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা কমানো হয়। জাতীয় বাজেটে এর অংশও নেমে আসে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও মূল বরাদ্দ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় বাজেট ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেই প্রকাশ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, টেন্ডার জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় বরাদ্দের বড় অংশ খরচ করা সম্ভব হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দীর্ঘ ও জটিল ক্রয়প্রক্রিয়া বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান বাধাগুলোর একটি। যে ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ হতে ১২ মাস লাগার কথা, অনেক সময় তা ১৮ মাস পর্যন্ত গড়ায়। এতে ব্যয় প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যায়। দেশে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলেও অনেক কর্মকর্তার এখনো এটি কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।’ আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক রুমানা হক আরও বলেন, ‘অর্থ ছাড় ও অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়াও বড় সমস্যা। সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা, পরিকল্পনাকারী ও বাজেট কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।’ বিদায়ি অর্থবছরে এডিপির আওতায় স্বাস্থ্য খাতে মোট ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে দুই বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকার বেশি। বাকি অর্থ ব্লক বরাদ্দ এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু আগের বছরের মতো এবারও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে ছিল। ফলে সংশোধিত এডিপিতে তাদের মূল বরাদ্দের ৬৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিভাগ দুটি ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৯৩৩ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপির প্রায় ২০ শতাংশ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি পেলেও বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে খণ্ডিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সেবার পুনরাবৃত্তি, ক্রয় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, দুর্নীতি, দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সমন্বিত স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভাবের মতো বিষয়।’