Image description

প্রকাশ্যে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দুই দুর্বৃত্ত গুলির পর একটি মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি কিলারদের। এমনকি তাদের পরিচয় সম্পর্কে এখনো অন্ধকারে তদন্তকারীরা। কারণ সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দুর্বৃত্তদের চেহারা পরিষ্কার বোঝা যায়নি। আবার ম্যানুয়াল সোর্সও ভালো নেই। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের পরও জট খুলতে পারছে না তদন্তকারী বিভিন্ন সংস্থা।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্ত এক যুবকের ছবি (সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে নেওয়া) প্রকাশ করে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ সদর দপ্তর। অথচ এখন পর্যন্ত সেই যুবকের সন্ধান মেলেনি। গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের উত্তর পাশে এক নারীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যার আগে নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ। ফুটেজ না মেলায় এ ঘটনার সাড়ে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার হয়নি খুনি। এমনকি ওই নারীর পরিচয়ও শনাক্ত হয়নি। গত ১৭ এপ্রিল পল্লবীর একটি সাবলেট বাসা থেকে ফিরোজা খানম জোসনা (৬৫) নামে এক নারীর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে সবাই স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে জানতেন। তার লাশের পাশে মেলে একটি রক্তমাখা হাতুড়ি। কিন্তু ফুটেজ না মেলায় এখনো খুনি শনাক্ত হয়নি। থানা পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে না পারায় মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

এখন সারা দেশেই খুনাখুনি, ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অহরহ ঘটনা আছে যেগুলোর কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফুটেজ মিললেও অনেক আসামিই গ্রেপ্তার হয় না। অনেক ঘটনায় আসামিকে শনাক্তই করা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ- ম্যানুয়াল সোর্সিং ভেঙে পড়েছে! যখন বড় কোনো ঘটনা ঘটে-তখন প্রযুক্তির মাধ্যমে কূলকিনারা না হলে তড়িঘড়ি করে সোর্স খোঁজা হয়। কিন্তু হঠাৎ করে সোর্স তথ্য দেওয়াকে নিরাপদ মনে করে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রয়োজনের তুলনায় সোর্সমানির পরিমাণ খুবই সামান্য। এজন্য সোর্সকে লম্বা সময় ধরে মেনটেইন করা সম্ভব হয় না। আবার সামান্য যে সোর্সমানি তাও অনেক সময় অপারেশনাল টিম লিডারদের কাছে পৌঁছায় না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার আগেই ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে সোর্সমানি উধাও হয়ে যায়। এ কারণে সংকটে পড়েন মামলার তদারকি ও তদন্ত কর্মকর্তারা। পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, সোর্সদের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। তারা প্রায় সবাই পেশা হিসেবে কাজটি করে থাকে। কিন্তু তাদের চাহিদা অনুযায়ী সোর্সমানি সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ম্যানুয়াল সোর্স প্রায় এড়িয়েই চলছেন কর্মকর্তারা। ম্যানুয়াল সোর্স ভেঙে পড়ায় সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে স্পর্শকাতর মামলা ও হত্যাকাে র আসামি গ্রেপ্তারে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বা অপরাধ জগতের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সোর্স সিস্টেমের যে খরচ তা সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব নানা প্রতিবন্ধকতার কারণেই টার্গেট কিলিংসহ অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে সংকট তীব্র করেছে অদক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা। কারণ মাঠপর্যায়ে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় সোর্সদের মেনটেইন করতে পারছেন না তারা। এ ছাড়াও সোর্সদের বিতর্কিত বেপরোয়া কার্যক্রমে বিব্রত হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় অনেকেই আর তাদের ওপর নির্ভর করেন না। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছালে সামগ্রিক সোর্স সিস্টেমে প্রভাব পড়ে। যা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভরতার সঙ্গে ম্যানুয়াল সোর্সও লাগবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভেঙে পড়া এই সোর্স কাঠামো পরিপূর্ণভাবে আর দাঁড়ায়নি। এলাকাভিত্তিক সোর্স সিস্টেমকে আবারও সক্রিয় করতে হবে। এতে প্রযুক্তির সহায়তায় কিছু পাওয়া না গেলে- অপরাধ ঘটার আগেই প্রতিরোধ ও অপরাধ ঘটার পরই আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার সম্ভব হবে। সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ম্যানুয়াল থেকে প্রযুক্তিতে স্থানান্তরে সোর্স নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়। এরকম ক্ষেত্রে যেসব দেশের ভালো উদাহরণ আছে- সেখান থেকে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তবে ম্যানুয়াল সোর্স সব দেশই রাখে। এ ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে সেটি ঠিক করতে হবে আগে। এরপর সে অনুযায়ী সোর্স মেনটেইন করতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধের প্রধান সোর্স হচ্ছে প্রমাণ। এটি যেকোনোভাবে পেলেই হলো। যখন প্রযুক্তির এত ব্যবহার ছিল না, তখন কোনো অপরাধ ঘটলে অনুমান করে সোর্সদের মাধ্যমে জানা হতো- কে এ কাজ করতে পারে। এরপর সন্দেহভাজনদের ধরে এনে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা হতো। এতে নিরপরাধ মানুষের হয়রানির সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে সোর্সরা নিজেরাই বিভিন্ন অপকর্মেও জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়াও অনেক রকম সমস্যা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যোগ্য কর্মকর্তার সংকট রয়েছে এটা সত্য। তবে অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে পোস্টিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না-কারণ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করলেও ওই আমলে ভালো পোস্টিংয়ে থাকায় এখন ফ্যাসিস্ট হিসেবে সমালোচনা করা হচ্ছে।