প্রতিবেশী ভারত থেকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ অথবা ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে বাংলায় কথা বলেন, এমন অনেক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা (পুশইন) বাড়তে পারে। দেশটির পশ্চিমবঙ্গে মে মাসের শুরুতে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ আশঙ্কা ক্রমেই বেড়েছে।
দেশের পশ্চিম সীমান্তে বিভিন্ন স্থানে চার শতাধিক মানুষকে জড়ো করার খবর ভারতভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছে। সরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আটক ব্যক্তিদের সীমান্ত অঞ্চলে নিয়ে এসে সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হতে পারে। একই সঙ্গে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ আটকে রেখে মানসিক চাপ তৈরি করা হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা ও কলারোয়ার কাকডাঙ্গা, কেড়াগাছি, তলুইগাছা, বৈকারী, মাদরা ও চন্দনপুর সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হতে পারে।
তবে সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবিও প্রস্তুত রয়েছে। সংস্থার উপ-মহাপরিচালক (মিডিয়া) কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিজিবির অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনোভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় সরকার পরিবর্তনের পর পুশইনের বিষয়টি যে শুধু সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর নজরদারির মধ্যে আছে, তা নয়। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে কথা বলছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সীমান্ত দিয়ে পুশইন বন্ধ করাসহ অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে। সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর থাকবে, এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এ আলোচনাগুলো আরও জোরালো হবে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের কথিত নাগরিকদের ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত ২৯ মে দিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য অবৈধভাবে অবস্থানরত কমপক্ষে ২ হাজার ৬৮০ ব্যক্তির তালিকা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সরকার দ্রুত পরিচয় নিশ্চিত করলে এসব ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসারে, উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্তে বর্তমানে প্রায় ১১০ ‘বাংলাদেশিকে’ একটি শেল্টার হোমে রাখা হয়েছে। গত ২৭ মে সকাল পর্যন্ত নতুন করে আরও ৭০ জনসহ ১৮০ জন ব্যক্তি বিএসএফের হেফাজতে রয়েছেন, যারা সবাই অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, রাতে সীমান্তবর্তী এলাকায় শক্তিশালী টর্চলাইট ও আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে বিজিবি সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের মতে, পুশইন প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক, তা নয়। এর সঙ্গে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী দালালচক্র জড়িত। তারা আটকের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, জাল পরিচয়পত্র তৈরি, সীমান্ত পারাপারের অবৈধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে থাকে। আটক হওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের চেষ্টা করে। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে সীমান্তে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পুশইনের এ বিষয়টি যে নতুন করে এসেছে, তা নয়। বিজেপি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে আসীন হওয়ার পর জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) তৈরি ও ব্যবহার করে বাংলায় কথা বলেন, এমন বহু মুসলিম নাগরিকের জন্ম বা পরিচয় প্রমাণের ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত আরোপ করার পর এ বিষয়ে দেশটিতে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, এটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিকের পরিচয়, মানবাধিকার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়। তারা মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক ও বিতর্কিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। হোল্ডিং সেন্টারে দীর্ঘ ‘বন্দিজীবন’ এড়াতে অনেকেই একসময় নিজেদের ‘বাংলাদেশি’ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হতে পারেন, এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সম্প্রতি দুই বাংলাদেশির মৃত্যু, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে বাঁশের খুঁটি স্থাপনের জন্য ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিএসএফের অপচেষ্টা, তিনবিঘা করিডর এলাকায় উত্তেজনা, ভারতীয় চোরাকারবারিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা, ড্রোন পড়া এবং পুশইনের আশঙ্কাসহ নানা ঘটনায় সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এর আগে বলেন, ১৯৫০ সালের একটি আইন ব্যবহার করে গত কয়েক মাসে প্রায় ২ হাজার জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করে দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সপ্রাণের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৩৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মে ও জুন মাসেই ছিল ২ হাজার ২০ জন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে, বলপ্রয়োগ করে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। সংস্থাটির মতে, পুশইন ও পুশব্যাকের মতো ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করে না, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীমান্তজুড়ে বিজিবির জনবল বৃদ্ধি করে টহল জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। কোনোভাবেই বিএসএফকে পুশইনের মতো কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি মাইকিং করে সীমান্তবর্তী মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে, যেন কেউ অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা না করে।