জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। মাসের পর মাস ঘুরেও মিলছে না সমাধান। ভুক্তভোগীরা এ জন্য সেবার কেন্দ্রীয়করণ ও কর্মকর্তাদের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন।
টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার বাসিন্দা কাওসার আহমেদ। দীর্ঘ দিন ধরে এনআইডিতে কাওসার নামের ইংরেজি বানানে 'ডব্লিউ' অক্ষর ব্যবহার করে আসছেন। তবে তাঁর অন্যান্য সনদে নামের ইংরেজি বানানে 'ইউ' অক্ষর রয়েছে। এখন তাঁর সরকারি চাকরির প্রয়োজনে এনআইডি সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে। 'ডাব্লিউ'-র জায়গায় 'ইউ' অক্ষর যুক্ত করার আবেদন করে দুই মাস পার হলেও এখনো সমাধান পাননি তিনি। দুই দিন পরপরই বিভিন্ন কাগজ ও সাক্ষী নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কেন্দ্রীয় অফিসে গেলেও হচ্ছে না সংশোধন।
গত ২৩ মে দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সপ্তম তলায় কাওসার আহমেদের সঙ্গে কথা হয় স্ট্রিম প্রতিবেদকের। এ সময় ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, 'আমার মাত্র একটি অক্ষরের পরিবর্তন। কিন্তু তার জন্য দুই দিন পরপরই চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা এই সাত তলার বেঞ্চে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখনো বলে স্যার নেই, আবার যেদিন স্যারকে পাওয়া যায় সেদিন চায় হয় কাগজ অথবা সাক্ষী। এখন পর্যন্ত সব ধরনের কাগজ ও সাক্ষী এনেছি। তবুও যেন তাঁদের মন ভরছে না। বেশিরভাগ সময় তো দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে পাওয়াই যায় না।'
ক্ষোভ প্রকাশ করে কাওসার আহমেদ বলেন, 'টাঙ্গাইল থেকে যাতায়াতে প্রচুর খরচ করতে হচ্ছে। যখনই আসি তখনই দুই-তিন জন সাক্ষী সঙ্গে নিয়ে আসতে হয়। এতে প্রতিবার চার হাজার টাকা করে খরচ হয়ে যাচ্ছে। আজকে সব কাগজ জমা দিয়েছি। এখন আর মোবাইলে মেসেজ না আসলে আসব না। এভাবে আর খরচ করা যায় না।'
নরসিংদী থেকে বয়স সংশোধনের জন্য তিনবার নির্বাচন কমিশনে এসেছেন ফিরোজ আলী। তবুও কাজ হয়নি। তিনি বলেন, 'আজ পর্যন্ত তিনবার এসেছি। প্রতিবার একেকটি কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলে। গেলে পিয়ন বলে স্যার রুমে নেই, বসেন অপেক্ষা করেন। সেই অপেক্ষায় পুরো দিন পার হয়ে যায়।'
রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে নামের আগে মোহাম্মদ শব্দটি বাতিল ও জন্ম তারিখ পরিবর্তন করতে এসেছেন নাইম ইসলাম। তিনিও দুইবার ঘুরে সমাধান পাননি। নাইম ইসলাম বলেন, 'সংশোধনের প্রথম হলো আমার নামে মোহাম্মদ এসেছে, সেটা বাতিল করব। জন্ম তারিখেও ভুল আছে। অনলাইনে আবেদন করেছি পাঁচ-ছয় মাস হয়ে গেছে, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। এখনো বলে দরখাস্ত রেখে যান, তাঁরা যোগাযোগ করবেন।'
কুষ্টিয়া থেকে এনআইডি সংশোধন করতে আসা ইমরান হোসেন গত ৪ মে আবেদনের ১৪ দিন পরও সমাধান পাননি। তিনি বলেন, 'আগে কুষ্টিয়াতেই এসব কাজ হতো। এখন সব এখানে পাঠিয়ে দেয়। ওখানকার অফিস থেকে বলেছে ঢাকায় গিয়ে দেখে আসতে। এখন দেখছি কী ভয়ানক অবস্থা।' মানিকগঞ্জের বাসিন্দা ইউসূফ আলী বাবার নাম সংশোধনের জন্য গত ২৫ এপ্রিল থেকে দুই দিন পরপর ইসিতে ধরনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, 'বাবার কাগজপত্রের সঙ্গে আমার কাগজপত্রের মিল নেই। এক দিন আসি তো একটা করে কাগজ আনতে বলে। এভাবেই দিন চলে যাচ্ছে।'
এনআইডি সংশোধনের জন্য আসা শতাধিক নাগরিককে প্রতিদিন এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। গত ২০, ২১ ও ২৩ মে স্ট্রিমের পক্ষ থেকে অন্তত ১০ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেকের দুর্ভোগ প্রায় একই ধরনের। তারা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিচয়পত্র সংশোধন শেষ না হলে ইসির প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়বে, এতে ইসিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিশ্বজুড়ে সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হলেও নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা কেন্দ্রীয়করণ করা হয়েছে। ফলে সামান্য সংশোধনের জন্যও সারা দেশের মানুষকে ঢাকায় আসতে হচ্ছে।
এদিকে, আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের পাশে প্রায় ২৫টি কম্পিউটারের দোকান এনআইডির নানা সেবা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গত ২০ মে এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'ভবনের ভেতরে কাজ যতটা জটিল, আমাদের এখানে ততটা সহজ ও দ্রুত হয়। কারণ ভেতরে আমাদের লোক রয়েছে। তাঁদের বললে তাঁরা দ্রুত করে দেন।' খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, 'দশ হাজারের নিচে কোনো কাজ হয় না। আপনারা কাজ দেওয়ার পর আমরা ভেতরে যোগাযোগ করি। তাঁরা যে রেট দেয়, আমরা সেই অনুযায়ী খরচ ধরি।' তবে ভেতরে কে আছেন, তা জানতে চাইলে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
ওই দিন বিকেলেই পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এসব দোকান বন্ধে অভিযান চালায় ইসি। তবে পরদিনও দোকানগুলো অর্ধেক খোলা রেখে কাজ চালাতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, 'আমরা অভিযান চালাইনি, পুলিশ চালিয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন কেন এখনো দোকানদাররা কাজ চালিয়ে যেতে পারছে।'
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, 'কোনো ভোগান্তি হচ্ছে না। আবেদন করবে, আবেদন পর্যালোচনার পরে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। এখন যদি এসে বলে এখনই করে দিতে হবে, তাহলে তো সম্ভব নয়। সে অর্থে ভোগান্তি রয়েছে, কিন্তু আমি তো এটা করতে পারব না।'
ইসি সচিব আরও বলেন, এনআইডি সংশোধন যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে। কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।