ঈদের দিন বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাত ১০টার দিকেও ফুটফুটে শিশু দুটিকে হাসিমুখে দেখেছেন প্রতিবেশীরা। এরপর আর দেখা মেলেনি তাদের। সঙ্গে নিখোঁজ ছিল শিশু দুটির নানি বেবী বেগমও। এরপর শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় ঘরের দরজা ভেঙে একে একে তিনজনের নিথর দেহ বের করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহত দুই শিশুর বাবা মাসুম ব্যাপারী সোনাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় তার স্ত্রীর দ্বিতীয় স্বামী রফিকুল হাওলাদারকে। স্বাক্ষী হিসেবে নাম দেওয়া হয় স্ত্রী ফাতেমা বেগম মেরীকে। ঘটনার পর থেকে মেরী বেগম তার মা এবং দুই সন্তানদের হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। কথা বলেছেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও। দায়ী করেছেন তার বর্তমান স্বামী রফিকুল হাওলাদারকে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে রফিকুলকে গ্রেপ্তারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলমান রয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে রফিকুলকে।
রোববার (৩১ মে) দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ মাসুম গাজী বসে আছেন মাটিতে। কিছুক্ষণ পরপর আদরের দুই সন্তান মুস্তাকিম ও শামিমের নাম নিয়ে বিলাপ করছেন। কিছুক্ষণ পরপর চিৎকার করে কাঁদছেন। কয়েকজন নিকটাত্মীয় আর প্রতিবেশী তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন।
মাসুম ব্যাপারী বলেন, ঈদের দিন সকালে আমি আলীর ক্লাব মোড়ে এসে আমার বাচ্চা দুটিকে আদর করে টাকা ও কোরবানির মাংস দিয়ে গিয়েছি। এরপর আর আমার দেখা হয়নি ওদের সঙ্গে। আমি অনেকবার বলেছি আমার ছেলে দুটিকে আমাকে দিয়ে দেও, কিন্তু দেয়নি। এখন ঠিকই দিল, কিন্তু লাশ অবস্থায়। আল্লাহ আমি এখন কী করব।’
মাসুম ব্যাপারীর দেওয়া বক্তব্য এবং রোববার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেলেও মেলেনি অনেক প্রশ্নের উত্তর। এসব নিয়ে অনুসন্ধানে নামে এশিয়া পোষ্ট। বের করার চেষ্টা করা হয় বৃদ্ধা বেবী বেগম আর তার দুই নাতির ভাগ্যে কী হয়েছিল, কখন হয়েছিল। এ ঘটনায় ফাতেমা বেগম মেরী জড়িত, নাকি তার দ্বিতীয় স্বামী একাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
লাশ ঘরে তালা দিয়ে বাইরে দুদিন খুঁজে বেড়িয়েছেন রফিকুল ও মেরী
পাশের ঘরের বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের আগের রাতে ওরা যখন ঈদের বাজার করে বাসায় আসে, তখন সঙ্গে রফিকুলও ছিল। ঈদের দিন আশপাশের বাসায় কোরবানির মাংস আনতে গিয়েছিল বড় ছেলে শামিম (১৩) ও বেবী বেগম। চার বছরের শিশু মুস্তাকিম পাশের বাসায় রানার সঙ্গে খেলতে গিয়েছিল।
রানার মা জান্নাতুল বলেন, ঈদের দিন বেলা ১১টার দিকেও মুস্তাকিম আমার ছেলের কাছে এসেছিল খেলতে। ওরা সবসময় একসঙ্গেই খেলাধুলা করত।

শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ঘরের মধ্যে মা এবং দুই সন্তানের লাশ লুকিয়ে রেখে তালা দিয়ে মাকে খুঁজতে বের হন ফাতেমা মেরী এবং তার স্বামী রফিকুল। দুপুরে হাজির হন কৈয়া বাজার মেরীর খালার বাসায়। সেখান থেকে খালাকে বলে ফুলতলার জামিরা এলাকায় মিজান নামে এক কবিরাজের কাছে যান মেরি ও রফিকুল। রাতে আবার ওই বাসায় ফিরে এসে রান্না করে খাবার খেয়ে রাতে একই সঙ্গে থাকেন তারা।
সকালে মেরী তাদের আত্মীয়দের কাছে আবারও ফোন দেন যে তার মা দুই সন্তানকে নিয়ে গেছে কি না। এরপর বিভিন্ন প্রতিবেশীদের বলেন, ‘মাকে খুঁজে পাচ্ছি না। সে আমার দুই ছেলেকে নিয়ে কোথায় চলে গেছে।’
পাশের বাসার শরিফুল বলেন, ‘সকালেও মেরী বলে তার মাকে খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে ওদের বাসার সব লোকই কিছুদিন পর কয়েক দিনের জন্য কোথাও যায়। ওর মা থাকলে ও থাকে না, ও থাকলে ওর মা থাকে না। তাই আমরা বিষয়টিকে এত গুরুত্ব দিইনি।’
নিহত বেবী বেগমের বোন সেরী বেগম বিকেলে বোনকে খুঁজতে যান ওই বাসায়, সেখানে রফিকুল ও মেরী দুজনই ছিলেন। খুঁজতে এসে পাশের রুম থেকে গন্ধ আসার কারণ জানতে চাইলে রফিকুল ও মেরী কোরবানির বর্জ্যের গন্ধ হতে পারে বলে জানান। এরপর তিনি মানতে নারাজ হয়ে প্রতিবেশী কামরুলকে ডেকে তার নাম্বার থেকে ৯৯৯ নম্বরে কল দিলে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দুই শিশুসহ বেবী বেগমের লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ আসার কিছুক্ষণ আগ পর্যন্ত রফিকুল মেরীর সঙ্গে ওই বাসাতেই ছিলেন। পরে লোক জড়ো হলে পাশের দেয়াল টপকে পেছন দিক থেকে পালিয়ে যান।
সোনাডাঙ্গা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবীর বলেন, মেরীকে মামলায় স্বাক্ষী রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মেরী বেগমের কথায় কিছু প্রশ্ন থাকলেও মোটাদাগে সত্য মনে হয়েছে। তাই তাকে প্রাথমিকভাবে আসামি করা হয়নি। তবে তদন্তাধীন অবস্থায় তার সম্পৃক্ততা পেলে তাকেও আসামি করা হবে। রফিকুলকে গ্রেপ্তার করতে পারলে খুব দ্রুত এ মামলার রহস্যের জট খুলবে। আশা করি, খুব দ্রুত রফিকুলকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
মেরী ও রফিকুল সম্পর্কে যা জানা যায়
পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ফাতেমা বেগম মেরীর প্রথম স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয় ২০২২ সালের শুরুতে। তখন মুস্তাকিমের বয়স মাত্র তিন মাস। ডিভোর্সের পর ফাতেমা রফিকুলকে বিয়ে করলেও অনেক দিনই তা গোপন রেখেছিলেন মা বেবী বেগমের কাছে। এক বছর হলো সবাই জেনে গেলেও মা বেবী বেগম তার ওই দ্বিতীয় জামাইকে কখনও মেনে নেননি।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, খুলনার রেলগেট মহেশ্বরপাশা এলাকার আলমগীর হাওলাদারের ছেলে রফিকুল হাওলাদার পেশায় একজন ট্রাকচালক। আন্তঃজেলা ট্রাকচালক থাকাকালীন একটি ট্রাক চুরির মামলায় থানায় আটক হওয়ার পর তাকে আর কেউ ট্রাক ভাড়া দিতেন না। রফিকুল আগে থেকেই মাদকাসক্ত থাকার কারণে ফাতেমাকে সঙ্গে নিয়ে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ফুলতলায় রফিকুলের আগের সংসারেও তিনটি সন্তান রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের অনেকে বলেছেন, ওই বাসায় সবসময় বেবী বেগম তার নাতিদের নিয়ে বেশি থাকতেন। ফাতেমা মাঝে মধ্যে কয়েক দিনের জন্য বাসা থেকে চলে যেতেন, আবার ফিরে আসতেন।
বৃহস্পতিবার রাতে কী ঘটেছিল
মরদেহ তিনটি ময়নাতদন্ত করেছেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. রনি ব্রক্ষ্ম। মৃত্যুর সময় নিয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে তার অটোপসি (ময়নাতদন্ত) রিপোর্ট পাওয়া লাগবে। তবে তিনটি শরীরই পচন ধরেছে। ২৪ ঘণ্টা বা তারও আগে কোনো সময় মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। হত্যার আগে তাদের কিছু খাওয়ানো হয়েছিল কি না, এসব বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
ফাতেমা বেগম মেরী বলেন, ‘ঈদের দিন বৃহস্পতিবার রাতে রফিকুল আমার বাসায় আসলে মায়ের সঙ্গে ওর অনেক ঝগড়া হয়। বাসা যেহেতু মা ভাড়া করেছিল, মা ওকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বললে ও তখন বের হয়ে যায়। এরপর সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। আমি অনেক ডাকাডাকি করার পর সেই দরজা খুলে দেয় রফিকুল। আমি তখন অবাক হয়ে বলি, তুমি ভেতরে ঢুকলা কীভাবে। ও তখন আমাকে বলে, আমি মায়ের কাছে পা ধরে মাফ চাইছি, মা মাফ করে দিয়েছে। তাই মা আমার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে ছেলেদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে গেছে। আগে-পরে বিভিন্ন সময়ে বেড়াতে যাওয়ায় আমি ওই মুহূর্তের জন্য কথাটা বিশ্বাস করেছিলাম।’
সোনাডাঙ্গা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন আহমেদ জানিয়েছেন, মেরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নিহত শিশুদের বাবা মাসুম ব্যাপারী যে মামলাটি করেছেন, সেখানে প্রধান আসামি করা হয়েছে রফিকুল হাওলাদারকে। মেরীকে আসামি করা হয়নি। ফলে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত না করা হলেও তদন্তের সন্দেহভাজন তালিকায় রাখা হয়েছে।
উত্তর মেলেনি যেসব প্রশ্নের
ঘটনার রাতে তাদের সঙ্গে আসলে কী হয়েছিল? রফিকুল একা খুন করেছেন, নাকি মেরীও তার সঙ্গে ছিলেন? কীভাবে কোনো বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছাড়া তিনজনকে হত্যা করা হলো? মেরি তার মাকে সব জায়গায় খুঁজলেও মায়ের কক্ষে তালা দেওয়া দেখে সেই তালা খুলে দেখার চেষ্টা করেননি? মরদেহ পচে গন্ধ বের হলে বাইরের মানুষ টের পেলেও ঘরের মধ্যে থেকেও টের পেলেন না মেরী?
তবে রফিকুলকে গ্রেপ্তারের আগপর্যন্ত কোনো বিষয় খোলাসা হবে না বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।