Image description

সকাল ৯টা। নরসিংদীর মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘরে জড়ো হয়েছে কয়েকজন শিশু।

কেউ ছড়া বলছে, কেউ রঙিন কাগজে আঁকিবুঁকি কাটছে, কেউবা খেলনায় মগ্ন। দেয়ালে টাঙানো স্বরবর্ণ, সংখ্যা, মাছ-পাখি আর প্রাণীর ছবির দিকে তাকিয়ে এক শিশু উচ্চারণ করার চেষ্টা করছে ‘অ আ ক খ’।

এই ঘরটি ছিল একটি ‘শিশু যত্নকেন্দ্র’। যেখানে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর ছোট শিশুদের নিরাপদে রেখে কাজ করতে যেতে পারতেন বাবা-মায়েরা।

শিশুদের শেখানো হতো ছড়া, গান, সামাজিক আচরণ। একই সঙ্গে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি থেকেও তারা থাকত সুরক্ষিত।

 

কিন্তু এখন সেই কেন্দ্র প্রায় বন্ধ। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় তালা ঝুলছে। আর তাতেই উদ্বেগে পড়েছেন অভিভাবক, মাঠকর্মী ও শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

কারণ বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন পানিতে ডুবে মৃত্যু। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশে বছরে প্রায় ১১ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ঝরে পড়ে প্রায় ৩০টি শিশুর প্রাণ।

এই বাস্তবতায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে নেওয়া ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্পকে কার্যকর মডেল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন প্রকল্পটির দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায়।

‘সবুজ পাতায়’ দ্বিতীয় ধাপের প্রস্তাব
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, আইসিবিসি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ উঠেছে।

বর্তমানে প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই চলছে। প্রকল্পের জনবল কাঠামো, সম্ভাব্য আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এরপর এটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) হয়ে একনেকে উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৩৮ কোটি টাকা। এর প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়ন করবে সরকার। প্রথম ধাপে ১৬ জেলায় কার্যক্রম থাকলেও এবার আরও ১৪ জেলা যুক্ত হয়ে মোট ৩০ জেলায় প্রকল্পটি সম্প্রসারিত হবে।

এতে ৭৯ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৯০টি শিশু যত্নকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আওতায় আসবে ১০ লাখ শিশু। এর মধ্যে ৬ লাখ শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে এবং ৪ লাখ শিশুকে প্রারম্ভিক বিকাশ কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।

শুধু দুর্ঘটনা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকট
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যু বাংলাদেশে নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে আছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়েই সবচেয়ে বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। কারণ এ সময় বাবা-মায়েরা কাজে ব্যস্ত থাকেন, আর ছোট শিশুরা থাকে অরক্ষিত।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) গবেষক মো. আল আমিন ভূইয়া বলেন, ‘যদি একটি শিশু সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত যত্নকেন্দ্রে থাকে, তাহলে তার ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি ৮০ শতাংশের বেশি কমে যায়। আর সাঁতার শিখলে সুরক্ষার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।’

তিনি বলেন, ‘এটা শুধু শিশু সুরক্ষা নয়, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধের সফল মডেল, থেমে আছে কার্যক্রম

দেড় বছরেই শেষ কার্যকর উদ্যোগ
যদিও প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২২ সালে, কিন্তু সরকারি জটিলতা ও কেনাকাটার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বাস্তব কাজ শুরু হতে সময় লাগে। ফলে কার্যক্রম পূর্ণমাত্রায় চলতে না চলতেই গত ডিসেম্বরের দিকে প্রথম ধাপের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।

শিশু একাডেমি সূত্রে জানা গেছে, সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্পের অধীনে দেশের ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ৮ হাজার ২০টি শিশু যত্নকেন্দ্রে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ২ লাখ ৫০০ শিশু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রে ভর্তি ছিল ২৫ থেকে ৩০টি শিশু।

এক হাজার ৬০০টি সুইম সেইফ সুবিধাকেন্দ্রে ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশু (বয়স ৬-১০ বছর) অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরমধ্যে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৯৮২ জন শিশু সাঁতার শেখা সম্পন্ন হয়েছে।

২ লাখ অভিভাবক শিশু লালন-পালনের বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। ১৬ হাজার নারী চাকরি ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত হয়েছেন। যত্নকেন্দ্রগুলোর যত্নকারী ও সহকারী যত্নকারীরা মৌলিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এছাড়া ১৬টি জেলা ও ৪৫টি উপজেলায় ইসিসিডি কর্মকর্তা ও সুপারভাইজার এবং সাঁতার প্রশিক্ষক ও সাঁতার সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের সুবিধা ভোগীদের কোনো অর্থ খরচ নেই।

প্রকল্পে মোট ব্যয় ছিল ৩০৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের অন্যান্য দপ্তরের সহায়তায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় শিশু একাডেমির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।

উন্নয়ন সহযোগী ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস এবং যুক্তরাজ্যের রয়েল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএন এলআই)। মোট প্রকল্প ব্যয়ের ২০ শতাংশ দিয়েছে তারা।

সেন্টার বন্ধ, এখন আবার ভয় লাগে
মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের যত্নকারী শান্তা বেগম বলেন, ‘সকাল ৯টায় বাচ্চারা আসত। আমরা ছড়া, গান, খেলাধুলার মাধ্যমে শেখাতাম। দুপুরে টিফিন দিয়ে ২টার দিকে ছুটি হতো। শিশুরা এখানে আনন্দে থাকত।’

তিনি বলেন, ‘আগে আমি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এই কাজের মাধ্যমে নিজের খরচ চালাতে পারতাম। এখন সেন্টার বন্ধ। আবার স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হয়।’

শুধু অর্থনৈতিক দিক নয়, শিশুদের পরিবর্তনও চোখে পড়েছে তার। শান্তা বলেন, ‘যে শিশুরা এখানে আসত, তারা স্কুলে গিয়ে অন্যদের চেয়ে ভালো করত। তাদের জড়তা কম ছিল।’

সহকারী যত্নকারী শিউলী আক্তারের কণ্ঠেও হতাশা। ‘তিন মাস ধরে কোনো আয় নেই। অথচ বাচ্চাগুলো এখানে কত ভালো থাকত,’ বলেন তিনি।

বাচ্চা এখন আবার রাস্তায় দৌড়ায়
অর্জুনচর এলাকার বাসিন্দা সুমা আক্তারের তিন মেয়ের মধ্যে ছোটটির বয়স দুই বছর। তিনি বলেন, ‘আমি কাজ করি। আগে সেন্টারে রেখে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম। এখন সারাক্ষণ ভয় লাগে। রাস্তার দিকে দৌড় দেয়, ময়লা খায়। কখন কী হয়!’

তার প্রশ্ন, ‘এত ভালো একটা সেন্টার কেন বন্ধ হলো? নতুন সরকার কি বোঝে না, এগুলো চালু থাকলে বাচ্চাগুলো নিরাপদ থাকে?’

দাদি হাজেরা খাতুনও নাতিকে নিয়ে আসতেন কেন্দ্রে। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে খেলত, শিখত। এখন তো বন্ধ। ভয় লাগে, কখন কী দুর্ঘটনা হয়।’

এদিকে, স্কুলগুলোও অপেক্ষা করে এসব শিশুর জন্য। মনোহরদীর শিশু যত্নকেন্দ্রের সুপারভাইজার তাহমিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘শিশুর নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় বিষয়। পাশাপাশি ভাষা, সামাজিকতা, আবেগ সবকিছুর বিকাশ হয় এখানে।’

তিনি বলেন, ‘স্কুলগুলোও আমাদের কেন্দ্রের শিশুদের নিতে আগ্রহী থাকে। কারণ তারা অন্যদের তুলনায় আত্মবিশ্বাসী ও এগিয়ে থাকে।’

ইসিসিডি কর্মকর্তা নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘গ্রামে চারপাশে জলাশয়, টিউবওয়েলের গর্ত, ব্যস্ত রাস্তা সব মিলিয়ে শিশুরা ঝুঁকিতে থাকে। এই কেন্দ্রগুলো তাদের নিরাপদ রাখার জন্যই করা হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাসায় থাকলে অনেক শিশু মোবাইল নিয়ে সময় কাটাত। এখানে এসে তারা বন্ধু পাচ্ছে, শিখছে, সামাজিকতা গড়ে উঠছে।’

দ্বিতীয় ধাপে কী থাকছে
প্রস্তাবিত দ্বিতীয় ধাপে শুধু শিশু যত্নকেন্দ্র নয়, বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রকল্পে সরাসরি ৩৪ হাজার ৪৭০ জনের কর্মসংস্থান হবে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৮৯০ জন শিশু যত্নকারী এবং সমসংখ্যক সহকারী যত্নকারী থাকবেন- যাদের সবাই নারী। এছাড়া প্রায় ৬ হাজার সাঁতার প্রশিক্ষকের অর্ধেক হবেন নারী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু শিশু সুরক্ষা নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকারের অবস্থান
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন এনডিসি বলেছেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সরকার গৃহীত ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্প ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফলাফল দেখিয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রারম্ভিক শিশুবিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় মনে করছে।

বাংলানিউজকে তিনি বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে আমাদের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রকল্পের কার্যক্রমের ফলে দেশে শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের জন্য নিরাপদ যত্নকেন্দ্র এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।’

তিনি জানান, প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদন (কমপ্লিশন রিপোর্ট) বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্প দপ্তর থেকে খুব শিগগিরই এটি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে প্রকল্পের বাস্তব অর্জন, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, শিশু সুরক্ষায় প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।

ইয়াসমীন পারভীন আরও বলেন, ‘প্রকল্পের ইতিবাচক ফলাফল এবং জনগণের ব্যাপক সাড়া বিবেচনায় নিয়ে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকার ইতোমধ্যেই দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা চাই, এই কার্যকর মডেলটি আরও বিস্তৃত আকারে দেশের অধিক সংখ্যক জেলায় বাস্তবায়িত হোক।’

তিনি জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত হবে। এতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রারম্ভিক শিশুবিকাশ, অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি, সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পাবে।

সচিব আরও বলেন, ‘শিশুদের নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রূপ দিতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।’

উদ্বেগও আছে
তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সরকারি প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর এই উদ্যোগটি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে কমিউনিটি-ভিত্তিক এই মডেল সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগের সুপারিশ করেছে।

বাংলাদেশেও প্রথম ধাপে ইতিবাচক ফল মিলেছে। কিন্তু ধারাবাহিকতা না থাকলে সেই অর্জন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ প্রতিদিন যখন ৩০টি শিশুর প্রাণ ঝরে যায়, তখন একটি কার্যকর উদ্যোগের থেমে যাওয়া শুধু একটি প্রকল্প বন্ধ হওয়া নয় বরং অসংখ্য পরিবারের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়া।

বিশেষজ্ঞের বক্তব্য
সোসাইটি ফর মিডিয়া অ্যান্ড সুইটেবল হিউম্যান-কম্যুনিকেশন টেকনিকের (সমষ্টি) নির্বাহী পরিচালক ও চ্যানেল আইয়েরর জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান বলেন, বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর বিষয়টি বহু বছর ধরেই আলোচনায় থাকলেও কার্যকর নীতিগত বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে গেছে। গত দুই দশক ধরে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার তথ্য উঠে এলেও, এ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ খুবই সীমিত।

তিনি বলেন, এ বাস্তবতায় ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড চাইল্ড কেয়ার (আইসিবিসি)’ প্রকল্প একটি সফল ও কার্যকর মডেল হিসেবে সামনে এসেছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু একাডেমি বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় আড়াই লাখ শিশুর মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ছিল শূন্য। এটি প্রমাণ করে, ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে শিশুদের কমিউনিটি-ভিত্তিক যত্নকেন্দ্রে নিরাপদ পরিবেশে রাখলে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমানো সম্ভব।

মাসরুর রনি বলেন, প্রকল্পটি শুধু শিশুদের জীবন রক্ষাই করেনি, বরং গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান ও পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। মায়েরা যখন নিশ্চিত হতে পারেন যে তাদের সন্তান নিরাপদে আছে, তখন তারা নিশ্চিন্তে গৃহস্থালি বা আয়মূলক কাজে সময় দিতে পারেন। ফলে পরিবারের উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।

তিনি আরও বলেন, এই মডেলটি অত্যন্ত স্বল্পব্যয়ী এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গ্রামের সাধারণ একটি ঘর ব্যবহার করেই কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হয়েছে। সেখানে শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। ফলে শিশুর সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের প্রারম্ভিক বিকাশও নিশ্চিত হয়েছে।

প্রকল্পটির দ্বিতীয় ধাপ দ্রুত অনুমোদনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের ডিপিপি সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও শিশুদের জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বন্ধ রাখা উচিত হবে না। প্রয়োজনে পরিসর ছোট করে হলেও প্রকল্পটি চালু রাখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, শিশুদের জীবন রক্ষার একটি কার্যকর জাতীয় মডেল। এখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।’