বাবুল হোসেন (৪০)। পেশায় সবজি বিক্রেতা। রাজধানীর সবুজবাগের মায়াকানন এলাকায় থাকেন পরিবার নিয়ে। প্রতিদিন ভোরে ভ্যান বোঝাই সবজি নিয়ে ছোটেন বাসাবো বালুর মাঠের দিকে। বিক্রি শেষে যা লাভ হয় তা দিয়েই চলে সংসার। বাবুল কোরবানির ঈদ এলেই হয়ে যান একদিনের ‘কসাই’। তার মতো এমন অনেকেই আছেন বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, সবুজবাগ, মায়াকানন, আহম্মদবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়।
তবে কসাইয়ের কাজে বাবুলদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। তারা পেশাদার কসাইও নন। তারা মৌসুমি কসাই। গরু-ছাগল কাটাকাটি দেখে তারা কসাইয়ের কাজ শিখেছেন। রাজধানীজুড়ে বাবুলদের মতো এমন মৌসুমি কসাইয়ের সংখ্যা এখন অনেক। জাত কসাইয়ের অভাবে কোরবানির জন্য এখন মৌসুমি এসব কসাইয়ের ওপর রাজধানীর বাসিন্দাদের নির্ভরতা বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফুটপাতের চায়ের দোকানদার, দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, সবজি-মাছ বিক্রেতা, কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ কোরবানির ঈদে মৌসুমি কসাইয়ের কাজ করে থাকেন।
১০ থেকে ১৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট
জানা যায়, কোরবানির ঈদে রাজধানীতে গরু-ছাগল মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ পশু জবাই হয়। বিপুলসংখ্যক পশু জবাই হওয়ায় পেশাদার কসাইদের দিয়ে পশুর চামড়া ছাড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে এ সময় বেড়ে যায় মৌসুমি কসাইদের চাহিদা।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যমতে, ঢাকায় প্রশিক্ষিত কসাইয়ের সংখ্যা ১১ হাজার ৬০০ জন। কোরবানির সব কাজ তাদের দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। চাহিদা থাকায় অন্যান্য পেশার খেটে খাওয়া মানুষ দুই একদিনের জন্য কসাই বা কসাইয়ের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তারা চার-পাঁচজন গ্রুপে গরু কাটার কাজ করেন।
চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় জোগান আসে কোরবানির ঈদের পশু থেকে। কসাই দক্ষ না হলে চামড়া ছাড়ানোর সময়ে কেটে যায় এবং চামড়ার সঙ্গে মাংস রয়ে যায়। বাংলাদেশ হাইডস অ্যান্ড স্কিনস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, অদক্ষ কসাইয়ের কারণে দেশে প্রতি বছর ২০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়।
রেট নিয়ে অরাজকতা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশু কাটানো ও চামড়া ছাড়ানোর জন্য কসাইদের নির্ধারিত কোনো রেট নেই। এলাকা ও কসাইভেদে ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নেওয়া হয়। কোথাও পশুর মূল্যের প্রতি হাজারে ১৫০ টাকা, কোথাও ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন কোরবানিদাতারা। বাসাবো, সবুজবাগ এলাকায় মৌসুমি কসাইদের দর গরু-ছাগল প্রতি হাজরে ১০০ টাকা, বাড্ডার আনন্দনগর এলাকায় প্রতি হাজারে ১৫০ টাকা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা ও ধানমন্ডি এলাকায় ২০০ টাকা ও বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় ১৫০ টাকা। অর্থাৎ কেউ যদি দেড় লাখ টাকার গরু কেনেন, তাহলে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা হিসাবে কসাইয়ের খরচ হবে ৩০ হাজার টাকা। আর ১৫০ টাকা হলে খরচ পড়বে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। ১০০ টাকা দর হলে খরচ পড়বে ১৫ হাজার টাকা।
কোরবানি দেন এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দর তুলনামূলক অনেক বেশি। বছরের একটা দিন ঈদ উৎসব হয় লোকজনও এটি নিয়ে তেমন কথা বলেন না। কিন্তু এটির একটি যৌক্তিক দর থাকা উচিত। দেড় লাখ টাকার গরুতে মাংস কাটা বাবদই যদি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় তা হলে সেটা বাড়তি চাপ হয়ে যায়। তাদের মতে, রাজধানীতে যেহেতু লাখ লাখ পশু কোরবানি হয় তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত সিটি করপোরেশনের।
বনশ্রীর জি ব্লকে কয়েকজন পেশাদার কসাইয়ের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মোস্তফা নামের এক কসাই বলেন, “প্রতি হাজারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এটাই আমাদের নির্ধারিত দর। আমরা নিজেরাই এই দর ঠিক করেছি। কোরবানির সময় আমাদের নিয়মিত ব্যবসা থাকে না। এক মাসের বেশি সময় বসে থাকতে হয়। এই সময় আয় না করলে খাব কী?”
তবে যারা মৌসুমি কসাই তারা এভাবে টাকা নেন না। তারা গরুর আকৃতি দেখে দরদাম করেন। ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় কাজ নেন তারা। মৌসুমি কসাইদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকে না। দা, চাপাতি, ধামা, গাছের গুঁড়ি- এগুলো পেশাদার কসাইরা নিয়ে আসেন।
ঢাকার বাইরে থেকেও আসে কসাই
বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রতি বছর পেশাদার আর সিজনাল-দুই ধরনের কসাই আসেন ঢাকায়। উত্তরবঙ্গ থেকে বেশি আসেন সিজনাল কসাইরা। মেহেরপুর আর সৈয়দপুর থেকে আসেন পেশাদার কসাইরা। এই ঈদে সৈয়দপুর থেকে বিমানে করে একদল পেশাদার কসাই ঢাকায় আসবেন বলে জানা গেছে। ঈদের এক বা দুদিন আগে তারা ঢাকায় আসেন। ঢাকার বিভিন্ন মেস বা হোটেলে ওঠেন। ঈদের দিন সকাল থেকে কাজ শুরু করেন। কাজ শেষে আবার চলে যান তারা।
অনলাইনেও পাওয়া যায় কসাই
অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচার সঙ্গে সঙ্গে এখন কসাইও পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ আছে কসাইদের জন্য। ঢাকা কসাই বাড়ি আর কসাই ডট কম এদের মধ্যে অন্যতম। বিক্রয় ডটকমের মতো ওয়েবসাইটেও অনেক পেশাদার কসাই নিজেদের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। তবে অনলাইনে কসাই ঠিক করলে খরচ একটু বেশি পড়ে। হাজারে ১৮০ থেকে ২২০ টাকার মতো পড়ে।