ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা তুলে যুদ্ধে নেমেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর সে আশা পূরণ হয়নি। এখন কিউবাকে একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। দেশটি দখলের কথা বলছে। এরই মধ্যে কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকেও অভিযুক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। ইরানে শাসনব্যবস্থার পতনে ব্যর্থ ট্রাম্প কেন এবার কিউবার দিকে নজর দিয়েছেন, তা নিয়ে লিখেছেন সিএনএনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক স্টিফেন কলিনসন।
ইরানে যা হাতছাড়া হয়েছিল, এখন তা কিউবায় খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেটি কী? শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা। তবে চাপে থাকা মার্কিন বাহিনী যদি কিউবায় কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তা উচ্চ রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকিও তৈরি করবে।
কমিউনিস্ট শাসিত দ্বীপরাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের ইতিহাস প্রায় ৭০ বছরের। দুই দেশের সম্পর্কে এবার একটি নাটকীয় মোড় এসেছে। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোকে গত বুধবার হত্যাকাণ্ড ও মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দিনটি ছিল কিউবার স্বাধীনতা দিবস।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো, নতুন কোনো সামরিক অভিযানের পক্ষে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ খুবই কম।
এমন এক সময়ে অভিযুক্ত করার ঘটনা ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তেলের অবরোধের কারণে কিউবায় মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। দেশটির সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটির ওপর কূটনৈতিক চাপও বাড়ছে। সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ হাভানার কাছে একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরেছেন।
বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরেই কিউবাকে একের পর এক হুমকি দিয়ে আসছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, দরিদ্র এই দেশের সঙ্গে তিনি যা খুশি তা–ই করতে পারেন। কিউবা ‘দখল করার গৌরব’ তাঁর হতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন। সবশেষ বুধবার তিনি বলেছেন, কিউবাকে ‘মুক্ত করছেন’ তিনি।
কাস্ত্রোকে অভিযুক্ত করার পেছনে রয়েছে ১৯৯৬ সালে দুটি বেসামরিক উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার ঘটনা। এতে চারজন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক। ওই ঘটনায় কাস্ত্রেকে অভিযুক্ত করাটা ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিমুখী চাল বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো আশা করছেন, এর মাধ্যমে কিউবার ওপর আরও চাপ বাড়ানো যাবে। ফলে দেশটি আলোচনায় বসতে রাজি হবে। আবার এই আইনি পদক্ষেপ কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের অজুহাতও হতে পারে। গত জানুয়ারিতে একইভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।

বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক লি শ্লেনকা। তিনি বলেন, কাস্ত্রেকে অভিযুক্ত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি কিউবার কাছ থেকে কোনো ছাড় আদায় করা হয়, তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। এর ফলে কিউবার মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ঐক্য তৈরি হবে। ফলে দেশটির নেতৃত্বের মানসিকতা আরও কঠোর হবে।
কিউবায় যে চাল চালা হচ্ছে, তা হলো ট্রাম্প প্রশাসনের একটি কৌশলের সর্বশেষ পরীক্ষা। কৌশলটি হলো—শত্রুদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার জন্য একদিকে অবরোধ আরোপ করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, আর অন্যদিকে শক্তি প্রয়োগের ভয় দেখানো। এই কৌশল ভেনেজুয়েলায় কাজে দিয়েছিল এবং দেলসি রদ্রিগেজকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করেছিল।
দেলসি ভেনেজুয়েলা সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। পরে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। এর পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও ভেনেজুয়েলার জনগণ এখনো তাদের গণতন্ত্রের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখেনি। ইরানের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের একই ধরনের কৌশল এতটাই ব্যর্থ হয়েছে যে ট্রাম্পের সামনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা ছাড়া আর কোনো পথ হয়তো নেই।
রাউল কাস্ত্রেকে অভিযুক্ত করার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি কিউবার কাছ থেকে কোনো ছাড় আদায় করা হয়, তা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
ঝুঁকি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরও
ভেনেজুয়েলা ও ইরানে অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় আকারের সামরিক প্রস্তুতি নিতে দেখা গিয়েছিল। কিউবার কাছাকাছি বর্তমানে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিউবা উপকূলে মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা উড়োজাহাজের চলাচল বেড়েছে। ইরান ও ভেনেজুয়েলায় হামলার আগেও এ ধরনের তৎপরতা বাড়তে দেখা গিয়েছিল।

তবে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো, নতুন কোনো সামরিক অভিযানের পক্ষে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ খুবই কম। সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরান যুদ্ধের বিরোধী। অনেকেই ট্রাম্পের নীতিকে সরাসরি তাদের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে মেলাতে শুরু করেছেন। জরিপগুলোয় আরও দেখা গেছে যে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের কিউবা নীতিরও বিপক্ষে।
কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাত ফ্লোরিডার কমিউনিস্টবিরোধী নির্বাসিত বাসিন্দাদের কাছে নিঃসন্দেহে জনপ্রিয় হবে। তাঁরা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। তবে এমন সংঘাত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য আরেকটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে কমার কারণে রিপাবলিকান পার্টি এমনিতেই চাপে রয়েছে।
এর মধ্যে নতুন কোনো সংঘাত ডেমোক্র্যাটদের এই দাবিকেই প্রমাণ করবে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোটারদের দুর্দশা সম্পর্কে পুরোপুরি উদাসীন। এমনকি কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি থেকে যদি কোনো সাফল্যও আসে, তার মূল্য বাড়িভাড়া মেটাতে এবং নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মার্কিন ভোটারদের কাছে খুব কমই হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন কেন কিউবায় নতুন একটি সংকট তৈরি করার কথা ভাবছে? আসলে ট্রাম্পের এমন একটি জয় খুবই প্রয়োজন, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে চাঙা করতে পারে।
এদিকে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনীর আকস্মিক অভিযানের চেয়ে কিউবায় যেকোনো মার্কিন অভিযানে অনেক বেশি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে। মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঝুঁকিও তৈরি করবে। কিউবার সামরিক বাহিনীতে সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। অনেক সরঞ্জাম পুরোনোও। তা সত্ত্বেও তারা মার্কিন সেনাদের ক্ষতি করতে সক্ষম।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের গবেষক লি শ্লেনকা বলেন, কিউবা এমন একটি প্রতিরক্ষামূলক নীতি অনুসরণ করে, যেখানে বিদেশি আগ্রাসন হলে পুরো জনগণকে সাড়া দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কোনো হামলা চালালে মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনা ঘটবে। তবে কিউবা সরকারের আমূল কোনো পরিবর্তন দেখা যাবে না। বড়জোর যা হবে, তা হলো—দেশটিতে নিপীড়ন বৃদ্ধি পাবে এবং গণতন্ত্র ও মুক্তবাজারের দিকে খুব সামান্য অগ্রগতি হবে।

কিউবায় জেতার সুযোগ কেন দেখছে যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্প প্রশাসন কেন কিউবায় নতুন একটি সংকট তৈরি করার কথা ভাবছে? আসলে ট্রাম্পের এমন একটি জয় খুবই প্রয়োজন, যা তাঁর পররাষ্ট্রনীতিকে চাঙা করতে পারে। তাঁর প্রশাসনের দাবি করে যে এই নীতি বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা ও সম্মান পুনরুদ্ধার করেছে। কিন্তু বাস্তবে এই নীতিকে বেশ নাজুক দেখাচ্ছে। কারণ, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পারেননি। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধেও ব্যর্থ হয়েছেন। এ ছাড়া গাজায় যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় যে ধাপগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা–ও এগিয়ে যেতে পারেননি।
জন এফ কেনেডি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী সব প্রেসিডেন্ট কিউবার প্রয়াত শাসক ফিদেল কাস্ত্রোর শাসনব্যবস্থা ধ্বংসে ব্যর্থ হয়েছেন। সে দিক দিয়ে এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে ঐতিহাসিক স্বীকৃতির লোভ রয়েছে ট্রাম্পের। তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবান অভিবাসীদের সন্তান। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি কিউবা সরকারকে উৎখাত করাকে রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য বানিয়ে রেখেছেন।
কিউবাকে প্রতিপক্ষ থেকে অনুগত দেশে পরিণত করা হলে তা ‘ডনরো ডকট্রিন’–কে আরও শক্তিশালী করবে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতির লক্ষ্য হলো পুরো পশ্চিম গোলার্ধের নিয়ন্ত্রণ করা। ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পাশাপাশি এই নীতির আওতায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের বিভিন্ন নির্বাচনে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদীদের সমর্থন করেছে।
ট্রাম্পের কিউবা নীতির কিছু দিক আগের মার্কিন প্রশাসনগুলোর মতোই। কিউবায় বসে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিপক্ষরা যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে গোয়েন্দাগিরি ও নজরদারি চালায়, তা নিয়ে মার্কিন সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই চিন্তিত। কিউবার শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা গেলে এই পরাশক্তিগুলো হাভানায় তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের হারাবে।

কিউবার বেসামরিক নাগরিকরাও কয়েক দশক ধরে দমনমূলক ও অর্থনৈতিকভাবে শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন। এই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো গেলে তাঁরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং আরও উন্নত জীবনের আশা করতে পারেন। যদিও অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়ে কিউবার মানুষের সন্দেহ রয়েছে।
কিউবা সরকার যে নিষ্ঠুর ও দমনমূলক, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। একই কথা ইরানের ক্ষেত্রেও বলা যেতে পারে। সেখানে বেসামরিক মানুষ বছরের পর বছর ধরে নিপীড়নের শিকার। এরই মধ্যে ট্রাম্পের অবরোধ তাঁদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কিউবা কিংবা ইরান—কোনো দেশেই শাসনব্যবস্থা এখনো ভেঙে পড়েনি। আর ট্রাম্প ইতিহাসে নিজের নাম লেখানোর জন্য যেসব কৌশল ব্যবহার করছেন, তার মানে হলো—যেকোনো বিজয়ের জন্য বিশাল মূল্য চোকাতে হবে।