পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র দুই দিন বাকি। অথচ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ পশুর হাটে সোমবার গভীর রাত পর্যন্তও দেখা যায়নি প্রত্যাশিত বেচাকেনা। টানা দুই দিনের বৃষ্টি, অতিরিক্ত দাম হাঁকা, ক্রেতাদের অপেক্ষার কৌশল এবং খামারিদের উচ্চমূল্যের প্রত্যাশা; সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির পশুর বাজারে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।
হাটে পশুর সরবরাহ কম নয়, বরং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ছোট ও মাঝারি গরুর উপস্থিতি বেশি। কিন্তু ক্রেতারা দাম শুনে পিছিয়ে যাচ্ছেন। আবার বিক্রেতারাও খরচ বেড়ে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে কম দামে গরু ছাড়তে নারাজ। ফলে কোরবানির বাজারে এখন চলছে এক ধরনের ‘অপেক্ষার খেলা’—ক্রেতা অপেক্ষা করছেন দাম কমার জন্য, আর বিক্রেতা অপেক্ষা করছেন শেষ মুহূর্তের উচ্চমূল্যের ক্রেতার জন্য।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষ এখন আবেগ দিয়ে নয়, হিসাব করে কোরবানি দিচ্ছেন। আর সেই বাস্তবতাই পুরো বাজারের ধরন বদলে দিয়েছে।
হাটে গরু প্রচুর, কিন্তু বড় গরুর ক্রেতা কম
রাজধানীর গাবতলী, আফতাবনগর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও কেরানীগঞ্জের হাট ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকারের গরু প্রচুর থাকলেও সেগুলোর সামনে ক্রেতার ভিড় তুলনামূলক কম। বেশিরভাগ মানুষ ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দিকে ঝুঁকছেন।
বিশেষ করে ৫০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে থাকা গরুর বিক্রি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। সীমিত বাজেটের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ ছোট গরুকেই এখন “সাশ্রয়ী কোরবানি” হিসেবে দেখছেন।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার সবচেয়ে দ্রুত বিক্রি হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার গরু। এছাড়া ছোট ছাগলের চাহিদাও বেড়েছে। অনেকে যৌথ কোরবানির পরিবর্তে নিজস্ব সামর্থ্যের মধ্যে ছোট গরু কিনে নিচ্ছেন।
২ লাখ টাকার গরু হাঁকা হচ্ছে সাড়ে ৩ লাখ
এবারের বাজারে সবচেয়ে বড় আলোচনা গরুর দাম নিয়ে। ক্রেতাদের অভিযোগ, বিক্রেতারা বাস্তব দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম হাঁকছেন।
হাটে গিয়ে দেখা গেছে, যে গরুর প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা, সেই গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। আবার ৩ লাখ টাকার গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। ফলে অনেক ক্রেতা দরদাম করেও গরু কিনতে পারছেন না। অনেকে আবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের ধারণা, ঈদের আগের রাতে বড় গরুর দাম কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে বিক্রেতাদের ভাষ্য, শেষ দুই দিনেই বাজার জমে ওঠে। তাই এখনই কম দামে গরু বিক্রি করলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
‘প্রতি গরুতে অন্তত ২০ হাজার টাকা খরচ বেড়েছে’
রাজধানীর একটি পশুর হাটে কথা হয় কুষ্টিয়া থেকে আসা এক গরু ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার মাঝারি আকারের প্রতিটি গরুতেই অন্তত ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। তার ভাষায়, ‘গত বছর যে গরু ২ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি, এবার সেই গরু ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার নিচে ছাড়ার সুযোগ নেই। গত বছর আড়াই লাখ টাকার গরু এবার ২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার গত বছর ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার গরু এবার তিন লাখ টাকার নিচে বিক্রি করা সম্ভব না।’
তিনি বলেন, “খামারিদের খরচ এত বেড়েছে যে কম দামে গরু বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই উঠবে না।”
বৃষ্টিতে দুর্ভোগ, বাড়ছে খামারিদের চাপ
টানা বৃষ্টিতে পশুর হাটগুলোতে কাদা-পানি জমে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। গরু ভিজে যাওয়া, খাবার নষ্ট হওয়া, পরিবহন বিলম্ব এবং শ্রমিক সংকট; সব মিলিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে খামারি ও ব্যাপারীদের ওপর।
বিভিন্ন হাটে দেখা গেছে, অনেকে প্লাস্টিকের ত্রিপল টাঙিয়ে গরু রক্ষার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ আবার বৃষ্টির কারণে হাটে গরু আনতেই দেরি করছেন।
খামারিরা বলছেন, এবার পশুখাদ্য, খড়, ভুসি, খৈল, ওষুধ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। অনেকে ব্যাংকঋণ না পেয়ে উচ্চ সুদে টাকা ধার করে গরু প্রস্তুত করেছেন। তাই তারা লোকসান দিয়ে গরু বিক্রি করতে রাজি নন।
দেশীয় খামারিদের দখলে পুরো বাজার
একসময় কোরবানির বাজার অনেকটাই নির্ভর করত ভারতীয় গরুর ওপর। কিন্তু সীমান্তে নজরদারি বাড়ায় এখন ভারতীয় গরুর প্রবেশ প্রায় বন্ধ। ফলে পুরো বাজার এখন দেশীয় খামারিদের নিয়ন্ত্রণে।
প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন কোরবানিযোগ্য পশুর উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি। গ্রামাঞ্চলের ছোট খামার ও পারিবারিক পর্যায়ের মোটাতাজাকরণ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পশুর সরবরাহও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে সরবরাহ বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় বড় গরুর বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
অনলাইনেও বাড়ছে পশু বিক্রি
এবারের কোরবানির বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো অনলাইন বেচাকেনা। অনেক খামারি এখন হাটে না এনে ফেসবুক লাইভ, ভিডিও কল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গরু বিক্রির চেষ্টা করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাটে গরু আনতে পরিবহন, শ্রমিক ও হাসিল খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাই অনেকেই অনলাইনে আগাম ক্রেতা খুঁজছেন।
বিশেষ করে ঢাকার কর্মব্যস্ত মানুষ অনলাইনে পশু দেখে বুকিং দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। এতে ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটের ওপরও প্রভাব পড়ছে।
‘শেষ দুই দিনের খেলা’ নিয়েই এখন হিসাব
যদিও সোমবার রাত পর্যন্ত বেচাকেনা তুলনামূলক কম ছিল, তবে ক্রেতা ও বিক্রেতা; উভয়পক্ষই মনে করছেন আজ মঙ্গলবার ও আগামীকাল বুধবার বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ‘শেষ দুই দিনের খেলাই আসল।’ যদি ক্রেতার চাপ হঠাৎ বেড়ে যায়, তাহলে বড় গরুর দাম আরও বাড়তে পারে। আবার প্রত্যাশিত ক্রেতা না এলে শেষ মুহূর্তে অনেক বিক্রেতাকে দর কমাতেও হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের কোরবানির বাজার শুধু পশু কেনাবেচার বাজার নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। মূল্যস্ফীতি, মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা, ডিজিটাল বাণিজ্যের বিস্তার এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চাপ—সবকিছুর প্রভাব এবার সরাসরি দেখা যাচ্ছে পশুর হাটে।
সব মিলিয়ে এবারের কোরবানির পশুর বাজারে যা ঘটছে, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভিন্ন ও অনিশ্চিত এক বাস্তবতা হিসেবেই দেখছেন খামারি, ব্যবসায়ী ও বাজার বিশ্লেষকরা।