Image description
ভুয়া বার্তায় ব্যাংক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ

ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে। কয়েকদিন ভালোমতো চললেও সম্প্রতি এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় মামলাব্যবস্থাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জ করে বসেছে প্রতারকচক্র। যানবাহনের মালিকদের মোবাইল ফোনে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস (বার্তা) পাঠিয়ে দ্রুত জরিমানা পরিশোধ করতে বলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকেই এ ধরনের ভুয়া বার্তা পেয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।

জানা যায়, জরিমানার কথা উল্লেখ করে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ওয়েবসাইটের ফিশিং লিংক যুক্ত করে গ্রাহকের ব্যাংক কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে সাইবার প্রতারকচক্র। বার্তা পাঠাতে ব্যবহার হচ্ছে +৬৩ কোডযুক্ত (ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোড) আন্তর্জাতিক নম্বর। লিংকে দেওয়া ওয়েবসাইটে ঢুকে যে কোনো গাড়ির নম্বর দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভুয়া মামলা তৈরি হয়ে যায়। এভাবে ভুয়া মামলার ভয় দেখিয়ে ব্যাংক কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোববার ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনেও এ ধরনের প্রতারণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বলছে, তারা মোবাইল ফোনে এসএমএস বা বার্তা নয়, মামলার তথ্য ডাকযোগে পাঠাচ্ছে। ভুয়া মেসেজের বিষয়ে ডিএমপি ও বিআরটিএ-এর পক্ষ থেকে যানবাহনসংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

৭ মে থেকে রাজধানীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অটোমেটেড ট্রাফিক প্রসিকিউশন’ এআইভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার শুরু হয়। প্রথম ধাপে রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, কাওরান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট মোড়, উত্তরা-এয়ারপোর্ট এলাকা, গুলশানসহ ব্যস্ততম ট্রাফিক পয়েন্টগুলোকে এর আওতায় আনা হয়। ধাপে ধাপে অন্তত ৫০০টি পয়েন্টে এ ধরনের এআইভিত্তিক ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রযুক্তিটি চালুর পর ২৩ মে পর্যন্ত ৬১১টি মামলা দায়ের করেছে ট্রাফিক বিভাগ।

এদিকে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, তারা এমন এসএমএস পেয়েছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছে-এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এক কনটেন্ট নির্মাতা ফেসবুকে দাবি করেন, তাকে ঢাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কথা জানিয়ে এসএমএসে যে তারিখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন তার মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চট্টগ্রামে ছিল। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান একই ধরনের এসএমএস পেয়েছেন বলে জানান। সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা প্রাইভেট কারের মালিক মাসুদ রানাও একই ধরনের এসএমএস পেয়েছেন। তিনি বলেন, এসএমএসে দেওয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে তার গাড়ির নিবন্ধন নম্বর দিলে দেখানো হয় শনিবার দিনের বেলা সাভারে তার গাড়ি নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। অথচ সেদিন তার গাড়িটি ঢাকায় ছিল। বিষয়টি নিয়ে খটকা লাগলে বিআরটিএতে খোঁজ নেন। তখন জানতে পারেন সেটি ভুয়া।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক গবেষক আরিফ মঈনুদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, সরকারি সংস্থা কখনোই বিদেশি নম্বর বা অচেনা ডোমেইন ব্যবহার করে জরিমানার এসএমএস পাঠায় না। এটি মূলত ব্যাংক কার্ডের তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ফিশিং চক্র। চক্রটি যানবাহনের মালিকদের মোবাইল ফোনে বিদেশি নম্বর থেকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস পাঠাচ্ছে। সেখানে জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি লিংক যুক্ত করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীকে বিআরটিএ-এর আদলে তৈরি একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে যাচ্ছে। এ তথ্যগুলো কোনো প্রতারকের হাতে গেলে বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে ওই কার্ড ব্যবহার করে অননুমোদিত লেনদেন করা সম্ভব।

এআই ক্যামেরার বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকা ডিএমপির সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, নতুন এ প্রযুক্তিটি চালুর পর ডিএমপি এখন পর্যন্ত মামলার তথ্য মোবাইল ফোনে নয়, ডাকযোগে পাঠাচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বেশকিছু অভিযোগ পেয়ে সতর্ক করেছেন।

ট্রাফিকসংশ্লিষ্টরা জানান, এ নতুন ব্যবস্থায় পাঁচ ধরনের লঙ্ঘনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেমন: লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইনের বাইরে গিয়ে থামা, বিপরীতমুখী চলা, অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা। এসব অপরাধ সংঘটিত হলেই এআই ক্যামেরা তাৎক্ষণিকভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। পরে সফটওয়্যার গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে বিআরটিএ-এর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি করা হয়।

প্রতারণার নমুনা : একটি এসএমএস-এর শুরুতে লেখা ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক জরিমানার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিজ্ঞপ্তি’।

এতে ‘2026-BD-47821-017/RE2’ নম্বর ব্যবহার করে ‘২৫শে মে, ২০২৬’ উল্লেখ করা হয়। এসএমএস-এর মূল বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম (ITS) দ্বারা আপনার যানবাহনটিকে একটি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সড়ক ট্রাফিক বিধিমালার প্রাসঙ্গিক বিধান অনুসারে, এই কেন্দ্র আপনাকে এই লঙ্ঘনের জন্য প্রথম জরিমানার নোটিশ জারি করেছে এবং একই সঙ্গে জাতীয় ড্রাইভার লাইসেন্স ডেটাবেজ এবং যানবাহন নিবন্ধন সিস্টেমে প্রাসঙ্গিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত করেছে। অভিযোগ বা অর্থ প্রদানের জন্য https://bspbrtcari-govbd.cc- ওয়েবসাইটটি উল্লেখ করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ছবি এবং জিপিএস অবস্থানের ডেটা দেখতে ‘১’ লিখে বার্তাটি পুনরায় খুলতে বলা হয়।

ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একটি এসএমএস-এর মাধ্যমে। মেসেজে প্রেরক হিসাবে কোনো সরকারি সংস্থা বা বিআরটিএ-এর নাম নেই। +৬৩ কোডযুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নম্বর: +৬৩ ৯৪৮ ৩৩১ ৮২৮২ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোড। প্রতিষ্ঠানাটি উল্লেখ করে, ওই ওয়েবসাইটে যে কোনো গাড়ির নম্বর দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভুয়া মামলা তৈরি হয়ে যায়। অভিযোগ হিসাবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ‘গতিসীমা অতিক্রম’ দেখানো হয় এবং জরিমানা নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার টাকা। এরপর পেমেন্ট ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কার্ডধারীর নাম, কার্ড নম্বর, মেয়াদের তারিখ ও সিভিভি নম্বর চাওয়া হয়। দ্রুত পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে বলা হয়, তিন দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করলে মাত্র দেড় হাজার টাকায় মামলা নিষ্পত্তি হবে।

ডিসমিসল্যাব আরও জানায়, ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এটি দেখতে অনেকটাই বিএসপি বিআরটিএ-এর মতো ডিজাইন করা। লোগো, রং ও ইন্টারফেস প্রায় একই ধরনের হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে প্রকৃত ডোমেইনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

নতুন এ প্রতারণার বিষয়ে সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং ডিএমপির পক্ষ থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিআরটিএ থেকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো মামলা দেওয়ার সুযোগ নেই এবং সংস্থাটি এ ধরনের কোনো মামলার জরিমানাও গ্রহণ করছে না। বিআরটিএ-এর নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা দাবি করলে তা সম্পূর্ণ প্রতারণা।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, সম্প্রতি ট্রাফিক বিভাগের নামে বিভিন্ন ভুয়া এসএমএস ও অনলাইন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী কোনো যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ঠিকানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত অফিশিয়াল চিঠি পাঠানো হয়। প্রয়োজন হলে শুধু সরকারি দুটি নম্বর ০১৩২০০৪২২০৭ এবং ০১৩২০০৪২২২৭ থেকে এসএমএস পাঠানো হয়ে থাকে। ট্রাফিক এআই বা ভিডিও মামলার জরিমানার অর্থ অনলাইন ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে উপায় ও সিবিবিএল-এর মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। তবে ট্রাফিক বিভাগ কখনোই কোনো ব্যক্তির কাছে পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না। এ ধরনের তথ্য কেউ চাইলে সেটিকে প্রতারণা হিসাবে বিবেচনা করে নগরবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।