বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক চার চেয়ারম্যানসহ ১৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার আমলনামা এখন দুদকের হাতে।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ জাফর সাদেক শিবলী অভিযোগটি প্রকাশ্যে অনুসন্ধান করছেন।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম সমকালকে ওই তথ্য জানিয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাওয়ার প্ল্যান্ট অনুমোদনে অনিয়ম, ক্যাপাসিটি চার্জ সিস্টেমে সরকারের বিদ্যুৎ ক্রয়ে কারসাজিসহ এই খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে ওই ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকালে ইতোমধ্যে দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, প্রকাশ্যে অনুসন্ধানের আগে দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট অভিযোগটির গোপন অনুসন্ধান চালিয়েছে। ওই সময় অভিযুক্তদের দুর্নীতির বিভিন্ন ধরনের রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়। এনফোর্সমেন্ট টিম সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের আলোকে বিগত কমিশন অভিযোগটি প্রকাশে অনুসন্ধানের অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে অভিযোগটির অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।
এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ঘুষগ্রহণ, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকল্প পাস করানো, সরকারি জমি দখল, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ঋণ গ্রহণ করে আত্মসাতসহ অন্যান্য অভিযোগ অনুসন্ধান করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিমের সদস্যরা একাধিক ঘটনাস্থল একাধিকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন।
গত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওইসব কর্মকর্তা উচ্চ পদে কর্মরত থেকে অনেক কর্মকর্তা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে বিদেশে বিপুল পরিমাণ স্থাবর অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। তাদের অবৈধ/জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা।
অভিযুক্ত পিডিবির সাবেক চার চেয়ারম্যান হলেন মো. আলমগীর কবির, খালেদ মাহমুদ, মো. মাহবুবুর রহমান, মো. বেলায়েত হোসেন। বাকি ৯ জন হলেন, প্রতিষ্ঠানের সাবেক এমডি মাসুম-আলবেরুনী, প্রতিষ্ঠানের সদস্য আনম ওবায়দুল্লাহ, সাবেক সদস্য মো. শামসুল আলম, প্রধান প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া, প্রকল্প পরিচালক শেখ মঈন উদ্দিন, পরিচালক সাইদ একরাম উল্লা, মনিরুজ্জামান ও আনম তারিক আব্দুল্লাহ।
এনফোর্সমেন্টের অনুসন্ধান বলছে, সাবেক চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ শান্তা ইরিন নামীয় প্রকল্পের স্পেস/ফ্ল্যাট নম্বর এ-২ এবং এ-৩ মাত্র এক বছরে ২৪ কোটি ২০ লাখ টাকায় ক্রয় করেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার পক্ষে এ ধরনের ক্রয় বেআইনি। তিনি ও তার স্ত্রী সায়মা জোহরার নামে শেলটেক শফিক্স টাওয়ারের ২ হাজার ৪০০ বর্গফুট বিশিষ্ট ফ্ল্যাট ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় ক্রয় করেন। শিটেক অ্যানিয়তমা প্রকল্পে আরেকটি ফ্ল্যাট ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭৮ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। যা একজন সরকারি কর্মকর্তার গৃহিনী স্ত্রীর পক্ষে ক্রয় করা অস্বাভাবিক। এসব সম্পদ ছাড়াও তাদের নামে ও বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে। যা অধিকতর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে।
সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান বিভিন্ন পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি থেকে এক বছরে প্রায় ১ কোটি টাকা সম্মানী নিয়েছেন। যা পরোক্ষভাবে ঘুষ লেনদেন। তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১টি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছে সাড়ে চার কোটি টাকায়। এছাড়া নিজ নামে, স্ত্রী-সন্তান ও নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গের নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম-আলবেরুনী একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন করবর্ষে মোট ১৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) বিনিয়োগ প্রদর্শন করেছেন। তার স্ত্রী সেলিনা আরজুও একাধিক করবর্ষে মোট ৪২ কোটি ১৯ লাখ টাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) বিনিয়োগ প্রদর্শন করেছেন। এছাড়া অন্য অভিযুক্তদের সম্পদের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে দুদকের হাতে।