রংপুর বিভাগের প্রায় দুই শতাধিক কসাই এবারও পশু কাটার জন্য ঢাকা যাচ্ছে, ট্রেন, বাস, বিমানে করে। প্রথম শ্রেণির ট্রেন ও বাসে করে এখন পর্যন্ত প্রায় শতাধিক কসাই ঢাকা পৌঁছেছেন। কেউ কেউ অগ্রিম বিমানের টিকিট কেটেছেন, ঈদের দিন যথাসময়ে ঢাকায় অভিজাত পরিবারের সেরা গরু কাটতে। কোরবানির তিন দিনে রংপুর, নীলফামারীর ও সৈয়দপুরের এসব কসাই চমকানোর মতো ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার বেশি আয় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কাউনিয়া উপজেলার তকিপল বাজারের কসাই রমজান আলী জানান, দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে মাংসের ব্যবসা করছি। এর আগে দুইবার কোরবানিতে ঢাকায় যায়া লাখের ওপর ইনকাম করছি। ওই পার্টি এবারো ডাকছে। বাসের অগ্রিম টিকিট কাটি রাখছি। ঈদের আগের দিন যাব। তবে রংপুর জেলা থাকি কম লোক যায়। সৈয়দপুর নীলফামারী থাকি অনেক লোক যায়।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দের রহিম পেশায় কৃষক। নিজের জমিজমা আবাদ করেই সংসার চালান। গত তিন বছর থেকে ঈদুল আজহার আগে ঢাকায় গিয়ে কসাইয়ের কাজ করেন রহিম।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ভাই ওখানে তিন দিনে ৭০ থেকে ৯০ হাজার পর্যন্ত ইনকাম করি। লোকলজ্জার ভয়ে এলাকার কাউকে এই কাজের কথা বলিনি। তবে কোরবানি আইলেই মুই ঢাকা চলি যাও সঙ্গে আরও দুইজনসহ। ২/৩ দিন কাজ করি চলি আইসো। মঙ্গলবারেই ঢাকা চলি যাইম। মহাজনের সঙ্গে কথা হইছে। এবার লাখের ওপর ইনকাম হইবে।
নীলমারীর সৈয়দপুর থেকে শতাধিক কসাই ঢাকার পথে
নীলফামারীর সৈয়দপুর মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ‘ছোটু নাদিম’ ঈদের আগের দিন ১০ জনের একটি দল নিয়ে বিমানে ঢাকায় যাবেন। টিকিটও কাটা হয়ে গেছে।
ছোটু নাদিম বলেন, আমাদের বাপ-দাদারাও কোরবানির ঈদে ঢাকায় কাজ করতে যেতেন। এখনও মানুষ আমাদের ডাকেন। চামড়া ছাড়ানো থেকে শুরু করে মাংস পিস করা, হাড় আলাদা করা-সব কাজেই দক্ষতা লাগে। ছোটবেলা থেকেই এসব কাজ শিখে বড় হয়েছি আমরা।
ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে এলেই সৈয়দপুর শহরসহ বিভিন্ন এলাকার মাংসপট্টিতে শুরু হয় অন্য রকম ব্যস্ততা। হাটের কোলাহলের পাশাপাশি বাড়তে থাকে কসাইদের ঢাকামুখী প্রস্তুতি।
প্রতিবছরের মতো এবারও সৈয়দপুর থেকে শতাধিক কসাই রাজধানীতে ছুটবেন কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার কাজে। কেউ যাবেন বাসে, কেউ ট্রেনে, অনেকে আবার বিমানযোগেও যাবেন। ঈদের কয়েকটি দিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গরু বানানোর কাজ শেষ করে তারা নিজ শহর সৈয়দপুরে ফিরবেন।
ছোটু নাদিমের মতো এই কসাইদের বড় একটি অংশ বিহারি। বংশ পরম্পরায় মাংস ব্যবসা ও কসাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। পশু জবাই ও মাংস কাটায় তাদের আলাদা দক্ষতা আছে। ঢাকায় তাদের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে।
ছোটু নাদিমের মতে, কসাইয়ের কাজটিও এক ধরনের শিল্প। নিখুঁতভাবে পশু জবাই, চামড়া অক্ষত রেখে ছাড়ানো কিংবা সুন্দরভাবে মাংস ভাগ করা-প্রতিটিতেই প্রয়োজন দক্ষতা। বাবার হাত ধরে প্রায় ২০ বছর আগে কসাইয়ের কাজে নামেন ছোটু। এরপর থেকে প্রতি ঈদেই ঢাকায় আসছেন। রাজধানীর অভিজাত অনেক পরিবারের বাড়িতে কাজ করেছেন। একসময় ঢাকার সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকার বাসাতেও কোরবানির গরু জবাই করেছেন। ছোটু জানান, তাদের থাকার ব্যবস্থাও করে দিতেন খোকা।
গত বছর চার সহযোগী নিয়ে ঢাকায় ১২টি গরু জবাই করেছিলেন ছোটু। সব মিলে আয় হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকা। সহযোগীদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে দেন তিনি। যাতায়াত খরচও নিজেই বহন করেন।
এবার সদস্য বেড়ে হয়েছে ১০ জন। দলটিকে তিন ভাগে ভাগ করে কাজ করার পরিকল্পনা। ইতোমধ্যে অনেক পরিবারই তাদের বুকিং দিয়ে রেখেছে।
ছোটু নাদিমের মতো সৈয়দপুর পৌর মাংসহাটির কসাই ফজলে রাব্বি, নওশাদ আলী ও খয়রাত হোসেনও যাচ্ছেন পৃথক দল নিয়ে। স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সি থেকে তারা বিমান টিকিটও কিনেছেন।
ফজলে রাব্বি বলেন, ঈদের আগে ঢাকাগামী বিমানে যাত্রী কম থাকে। কারণ, তখন সবাই ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে আসেন। তাই বিমান কোম্পানিগুলো ভাড়া কমিয়ে দেয়। আমরা সেই সুযোগটা কাজে লাগাই।
কসাই মো. মিন্টু বলেন, সবাই পরিবার নিয়ে ঈদ করতে চায়। কিন্তু আমরা বাড়তি টাকার আশায় ঢাকায় যাই। ঢাকায় মাংস কাটার রেট অনেক বেশি। সৈয়দপুরে ১ লাখ টাকা দামের একটি গরু বানিয়ে সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অথচ ঢাকায় একই কাজের জন্য পাওয়া যায় ২০-২৫ হাজার টাকা। একজন অভিজ্ঞ কসাই ঈদের তিন দিনে অন্তত ১০টি গরুর মাংস কাটতে পারেন। ফলে তিন দিনের কাজ শেষে অনেকে ভালো অঙ্কের আয় করে বাড়ি ফেরেন।
ঢাকার অনেক পরিবার এখন সৈয়দপুরের কসাইদের নাম ধরেই চেনেন। অনেকের মোবাইল নম্বরও সংরক্ষিত থাকে তাদের কাছে।
সৈয়দপুর শহরের কারখানা গেট বাজারের কসাই মোস্তাকিম বলেন, আগে আমার বাবা ঢাকায় যেতেন। মূলত গুলশান-বনানীর বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্টে কাজ করতেন। তিন বছর ধরে আমি বাবার দেওয়া ঠিকানায় যাচ্ছি। ওই অ্যাপার্টমেন্টের গ্যারেজেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
ঈদ শেষে আবার কেউ বিমানে, কেউ বাস বা ট্রেনে করে ফিরে আসেন। শুরু হয় পুরোনো জীবনের ব্যস্ততা।
এদিকে সৈয়দপুর গোলহাটের কসাই সুলতান জানান, ঈদের কথা চিন্তা করি মাসখানেক আগেই ঢাকার অনেকেই সৈয়দপুরের কসাই বুকিং দিয়ে রেখেছেন। এ কারণে ঈদের ২/৩ দিন আগেই ঢাকায় সব কসাইকে পৌঁছাতে হবে। গতবারের মতো হাজারে ২০০ টাকা দিতে হবে বলে কসাইদের সঙ্গে কন্ট্রাক হয়েছে। এক লাখ টাকার একটি গরুতে কসাইকে দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। তবে এবারে দাম বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিছে ঢাকার মহাজন।
রংপুর বিভাগীয় মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল কাদের আনছারী এশিয়া পোস্টকে জানান, রংপুর বিভাগের মধ্যে সৈয়দপুর থেকেই বেশি কসাই ঢাকায় গরু কাটতে যায়। রাজধানীতে মাংস কাটতে আমাদের কসাইরা সৈয়দপুরের চেয়ে দ্বিগুণ মজুরি পান। সে কারণে প্রতি বছর প্রায় দুই শতাধিক কসাই ঢাকায় পাড়ি জমান। সৈয়দপুরে যেখানে প্রতি হাজারে ৮০-১০০ টাকা, রংপুরে ১০০-১২০ মেলে। সেখানে রাজধানীর ঢাকায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মেলে প্রতি হাজারে। আবার বেশি দামের গরুর সংখ্যা বহুগুণ।
ইতোমধ্যে যাদের বুকিং হয়েছে তাদের কেউ কেউ বিমানের, ট্রেনের অথবা বাসের টিকিট কেটেছেন। আবার অনেকে দুই সপ্তাহ আগেই ঢাকায় গেছেন বুকিং করতে। এভাবে রংপুর বিভাগের প্রায় দুই শতাধিক কসাই কোরবানির মাংস কাটতে পাড়ি জমাবেন ঢাকা। তবে এই কসাইদের বড় একটা অংশ পেশাদার কসাই না। অনেকেই অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত। শুধুমাত্র ঈদের তিনদিন গরু কাটার কাজ করার উদ্দেশ্যেই ঢাকায় পাড়ি জমান।