ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম ওমর ফারুক খানকে পদত্যাগে ‘চাপ’ দিয়েছে ব্যাংকটির পর্ষদ। রোববার পর্ষদের কাছে তাকে পদত্যাগপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এদিন ব্যাংকটির পর্ষদ সভা রয়েছে।
ওমর ফারুক বর্তমানে ৪৯ দিনের ‘বাধ্যতামূলক’ ছুটিতে আছেন, যা শেষ হবে ৩১ মে। ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ার আগে রোববারই শেষ কার্যদিবস ।
এর আগে, ওমর ফারুক ১৫ দিনের শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি চেয়ে আবেদন করলে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ তাকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠায়। গত ১২ এপ্রিল থেকে ছুটিতে আছেন এই শীর্ষ ব্যাংকার।
ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র টাইমসের কাছে দাবি করেছে, রাজনৈতিক কারণে ওমর ফারুককে ব্যাংকটির এমডি পদে রাখতে চাইছে না ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’। তবে এই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কে বা কারা সেই বিষয়ে কেউ মুখ খুলেননি।
ওমর ফারুক জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে ওই সূত্রগুলো। এ ছাড়া সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের সময় জামায়াতের পক্ষে প্রচারে ইসলামী ব্যাংককে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে অন্য দুটি সূত্র বলেছে, ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থাতেই ডিএমডি পদোন্নতি পেয়েছেন ওমর ফারুক। এমনকি ওই সময়ে বিজনেস ডেভলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ছিলেন তিনি। এই বিষয়টিকেও ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হচ্ছে।
এ ছাড়া নাসা গ্রুপের একটি ঋণ অনিয়মের সঙ্গে ওমর ফারুকের সংশ্লিষ্টতার বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল।
জানা গেছে, ওমর ফারুকের নিয়োগের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি দুবার ফেরত গিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তর থেকে। তৃতীয় বারে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিয়োগ অনুমোদন করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘বিআরপিডি (ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ) থেকে ওমর ফারুকের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যখন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দপ্তরে গিয়েছিল, সেখানে তার সম্পর্কে কিছু নোট লেখা ছিল। এগুলোকেই হয়ত বর্তমান কর্তৃপক্ষ সামনে এনে ওমর ফারুককে সরাতে চাইছে। তবে বিদায়টা যাতে সম্মানজনক হয়, সেজন্য তাকে হয়ত পদত্যাগের জন্য বলা হতে পারে।’
পদত্যাগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ওমর ফারুক। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমানও কোনো বক্তব্য দেননি।
মো. ওমর ফারুক খান ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ পান। এর আগে ওই বছরের মে মাসে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি মুহাম্মদ মুনিরুল মওলা চাকরি হারান। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ওমর ফারুক প্রথমে এমডির চলতি দায়িত্ব পান।
তিনি ১৯৮৬ সালে ইসলামী ব্যাংকে যোগ দিয়ে ব্যাংকিং কর্মজীবন শুরু করেন। বিগত সরকারের সময়ে ডিএমডি থাকাবস্থায় পদত্যাগ করে তিনি এনআরবি ব্যাংকের অতিরিক্ত এমডি হিসেবে যোগ দেন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে আবদুল জলিল নামের একজন পরিচালককে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তিনি ব্যাংকটির পাঁচ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদে একমাত্র জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাকে সরিয়ে এস এম আবদুল হামিদ নামের আরেকজনকে পরিচালক করা হয়।
এর আগে, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের মুখে ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই পদত্যাগপত্র জমা দেন ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২২ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে তা পুনর্গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চেয়ারম্যান করা হয় মাসুদকে। মাসুদের পরে চেয়ারম্যান করা হয় জুবায়দুর রহমানকে।
উল্লেখ্য, অনেক বছর ইসলামী ব্যাংক জামায়াতপন্থী লোকজন এবং কয়েকটি মুসলিম দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার শক্তি ব্যবহার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা নিয়ে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।