Image description

সীমান্ত নিয়ে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনায় বাড়তি সতর্কতায় রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সম্প্রতি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সঙ্গে উত্তেজনা ও সিলেট সীমান্তে চোরাকারবারিদের লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার পাটগ্রামে বিজিবির বাধায় বেড়া নির্মাণ না করেই বিএসএফ পিছু হটলেও সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অন্যদিকে সিলেটে উত্তেজনা কমলেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া নেত্রকোনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহীসহ দেশের সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা কমাতে বাড়তি সতর্কতায় রয়েছে বিএসএফ। লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, শুক্রবার লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম সীমান্তে তিনবিঘা করিডর এলাকায় বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করে বিএসএফ। এ নিয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তুমুল উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষ অস্ত্র তাক করে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে বিজিবির অনড় অবস্থানে বিএসএফ কাজ বন্ধ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

স্থানীয় ও বিজিবি সদস্যরা জানান, শুক্রবার তিনবিঘা করিডরের ৭ নম্বর পিলারের ৩০ নম্বর সাব-পিলার সংলগ্ন সীমান্তের শূন্যরেখার মাত্র ১০ থেকে ২০ গজের মধ্যে ভারতীয় একাধিক দপ্তরের কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের নিয়ে পরিমাপ শুরু করে বিএসএফ। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অমান্য করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্দেশ্যে তারা ৩ থেকে ৪ ফুট উচ্চতার বাঁশের খুঁটি স্থাপন করতে থাকে। এ সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ১৭৪-বিএসএফ ব্যাটালিয়নের ভীম ক্যাম্পের অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জন সশস্ত্র বিএসএফ সদস্য তাদের পাহারা দেন। খবর পেয়ে বিজিবির পানবাড়ী কোম্পানির কমান্ডার সুবেদার সোলেমান আলী তাৎক্ষণিক টহল দল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তিনি বিএসএফকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু বিএসএফ বিজিবির আপত্তি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।

একপর্যায়ে বিজিবি কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে সীমান্তে ৪ থেকে ৫টি সেকশনে ভাগ হয়ে ভারী অস্ত্র নিয়ে সম্পূর্ণ প্রতিরোধমুখী অবস্থান নেয়। বিজিবির এমন রণপ্রস্তুতি দেখে বিএসএফও পাল্টা অবস্থান নিলে সীমান্তে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই ঘটনায় সীমান্তবর্তী দহগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দারা চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পড়েন। পরবর্তীতে রাত ৮টায় বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি টেলিফোন আলাপ হয়। এতে ৫১-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজিউর রহমান এবং ভারতের ১৭৪-বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট ভিনোদ রেধু কথা বলেন। বিজিবি জানায়, টেলিফোনে আলাপকালে বিএসএফ সীমান্তে উত্তেজনা নিরসনে তাদের বিতর্কিত কাজ স্থগিত করার আশ্বাস দেয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা নিজ নিজ ক্যাম্পে ফিরে গেলে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

এ বিষয়ে বিজিবি ৫১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান বলেন, সীমান্ত আইন না মেনে বিএসএফ শূন্যরেখায় কোনো কাজ করলে বিজিবি তা কোনো অবস্থাতেই মেনে নেবে না। পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে একটি পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হলে বিএসএফ তাতে সাড়া দেয়নি। তবে বর্তমানে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ও স্বাভাবিক রয়েছে।

সিলেট প্রতিনিধি জানান, সম্প্রতি বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর সিলেট সীমান্তে আর কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেনি। তবে সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা, মাদক ও চোরাচালান রোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ১৮ মে বিকালে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে বিনা উসকানিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গুলি ছোড়ে বিএসএফ। তাৎক্ষণিক জবাবে পাল্টা গুলি ছোড়ে বিজিবি। এতে আগ্রাসী অবস্থান থেকে পিছু হটে বিএসএফ।

বিজিবি সিলেট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবির টহল আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে টহলরত বিজিবি সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। দিন ও রাত সমানতালে টহল চলছে।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ভারতের সঙ্গে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার সীমান্তের মাত্র ১৮ কিলোমিটারে কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। বাকি অংশ উন্মুক্ত থাকলেও সেখানে এখনো কোনো উত্তেজনা দেখা যায়নি। বিজিজি ৪৭-ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, এখন পর্যন্ত কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে কোনো ধরনের আনএক্সপেক্টেড সিচুয়েশন লক্ষ্য করা যায়নি। যে কারণে সীমান্তে কোনো ধরনের উত্তেজনা নেই। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী মেহেরপুর এবং চুয়াডাঙ্গা সীমান্তের পরিস্থিতিও স্বাভাবিক রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, নেত্রকোনা দুর্গাপুর এবং কলমাকান্দা উপজেলার সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। এই দুই উপজেলার দুর্গাপুরে বিজয়পুর সীমান্ত থেকে কলমাকান্দার পাঁচগাও সীমান্ত পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। যে কারণে মেঘালয়ের পাদদেশে নেত্রকোনার সীমান্ত নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই। নেত্রকোনা ৩১-ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী পিএসসি জানান, আমাদের অধীনে নেত্রকোনাসহ ময়মনসিংহের মুন্সিপাড়া, চারিয়াপাড়া ও মধুপাড়া তিনটি বিওপি রয়েছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা থেকে মহেষখলা ও মোহনগঞ্জ এলাকায় দুটি বিওপিসহ মোট ১০টি বিওপি আছে। তবে বর্তমানে কোথাও কোনো ধরনের উত্তেজনা নেই।

রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, ভারতের সঙ্গে রাজশাহীর প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত থাকলেও মাত্র ১১ কিলোমিটার এলাকায় আছে কাঁটাতারের বেড়া। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে বিএসএফ।