Image description

বাংলাদেশে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের পর এবার শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’। এই উদ্যোগের পেছনে সরকারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো।

সরকার বলছে, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের দেওয়া হবে এই কার্ড।

অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছে, শুধু নতুন কার্ড চালু করলেই হবে না; এর সঙ্গে কার্যকর ডিজিটাল অবকাঠামো, ব্যাংকিং নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী কার্ড চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাড়াহুড়া করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, প্রবাসী কার্ডের প্রধান লক্ষ্য থাকবে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া, প্রবাসীদের তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা এবং তাঁদের জন্য বিশেষ আর্থিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করা।

সূত্র বলছে, ভিসা বা মাস্টারকার্ডের সঙ্গে যুক্ত রেখে এই কার্ড দিয়েই দেশে-বিদেশে টাকা আদান-প্রদান করা যাবে।

প্রবাসী কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি প্রবাসী কার্ড চালুর বিষয়ে বলেন, প্রবাসীদের জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে। যাঁরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তাঁদের কী ধরনের সম্মান ও সহযোগিতা দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে কাজ করছে সরকার।

এ ছাড়া প্রবাসীদের বিনিয়োগ নিরাপদ ও সহজ করতে সরকার বিশেষ আবাসন ও বিনিয়োগ সহায়তা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রবাসী কার্ডের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কত দূর—জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রবাসী কার্ড বাস্তবায়নে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। বর্তমানে এই কার্ডের নকশা এবং এটি কিভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রেজেন্টেশন আমরা দেখেছি। যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এই কার্ড বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া অনেকটা বর্তমানে প্রচলিত ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো হবে এবং এটি নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী কোনো একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।কারা প্রাথমিকভাবে এই প্রবাসী কার্ড পাবেন, জানতে চাইলে নুর বলেন, ‘এই কার্ডের জন্য যাঁরা আবেদন করবেন, তাঁরা পাবেন। তবে বিএমইটি কার্ডধারী যাঁদের তথ্য এরই মধ্যে আমাদের পিআইডি সার্ভারে আছে, তাঁদের সহজে সংযুক্ত করা যাবে। তাঁদের পাশাপাশি যেকোনো প্রবাসী আবেদন করার মাধ্যমে কার্ডটি সংগ্রহ করতে পারবেন। মূলত সব প্রবাসীকে এই সেবার আওতায় আনা আমাদের লক্ষ্য।’

প্রবাসী কার্ডে যেসব সুবিধা : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্তত দেড় কোটি বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। তবে নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে এই সংখ্যা বাস্তবে আরো বেশি হতে পারে। সরকার নতুন করে প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে সবাইকে হিসাবে আনতে চায়।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, প্রবাসী কার্ডে কিউআর কোডভিত্তিক পরিচয় ব্যবস্থা থাকবে। যেকোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ সেই কোড স্ক্যান করলেই সংশ্লিষ্ট প্রবাসীর তথ্য দেখতে পারবে। এমনকি মোবাইলের মাধ্যমেও কার্ড ব্যবহার করা যাবে। নতুন প্রবাসী কার্ড হবে আরো আধুনিক ও বহুমুখী। বিশেষ করে এতে যুক্ত হবে ব্যাংকিং সুবিধা। ডুয়াল কারেন্সি ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন প্রবাসী একই কার্ডে বিদেশি মুদ্রা ও বাংলাদেশি টাকায় লেনদেন করতে পারবেন।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ‘সক্রিয় সরকার’ হিসেবে দ্রুত দৃশ্যমান সাফল্য দেখানোর উদ্দেশ্যে তিন মাসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে প্রবাসী কার্ড চালু করা ঠিক হবে না। তাঁরা মনে করছেন, সারা দেশে একযোগে চালুর আগে একটি পরীক্ষামূলক বা ট্রায়াল ফেজ পরিচালনা করা উচিত।

কার্ড নিয়ে প্রশ্ন অনেকের : ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বৈধভাবে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য বিএমইটি কার্ড চালু করা হয়। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের নিবন্ধনের অংশ হিসেবে এই কার্ড দেওয়া হতো। এতে কর্মীর পরিচয়, পাসপোর্ট, কর্মস্থলসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত থাকত। এবারের প্রবাসী কার্ডও একই ধরনের হবে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক প্রবাসী।

সৌদি আরব প্রবাসী সাহাদাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিএমইটি কার্ড পেয়েছিলাম। করতে বাধ্য ছিলাম দেখে করেছিলাম। এর কোনো সুফল কখনো পাইনি। এখন নতুন সরকার প্রবাসী কার্ড চালু করছে। এতে আসলে কী লাভ হবে, তা জানি না। আমাদের দেশে গেলে তো ভোগান্তির সীমা থাকে না। সেসব দিকে নজর দিলে ভালো হয়।’

দুবাইপ্রবাসী শিবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, বিদেশিদের জন্য সব সরকার মুখ মুখে অনেক কিছু করে, বাস্তবে তেমন কিছু দেখি না। বিএমইটি কার্ড নিয়েও অনেক কিছু শুনেছি, এখন প্রবাসী কার্ড! বাস্তবে কতটুকু প্রবাসীদের লাভ হবে, তা জানি না।

প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে জনগণের কতটুকু লাভ হবে, জানতে চাইলে অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর কালের কণ্ঠকে বলেন, সাফল্য দেখাতে অতিরিক্ত তাড়াহুড়া করা উচিত হবে না। এর আগে বিএমইটি যে স্মার্টকার্ড চালু করেছিল, সেটি মূলত বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের কাজে ব্যবহৃত হতো। বেশির ভাগ কর্মী এটিকে কেবল বিদেশ যাওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ বা টিকিট হিসেবেই দেখতেন। তাই নতুন প্রবাসী কার্ড চালুর আগে কর্মীদের জন্য কার্যকর ‘প্রি-ডিপারচার ব্রিফিং’ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তাঁরা কার্ডটির প্রয়োজনীয়তা, ব্যবহার ও সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান।

এই কার্ডের সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি, হয়রানি বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা যেন সহজে সেবা পান, সে জন্য এটিকে অনলাইন ওরিয়েন্টেড করা হচ্ছে। যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ, তাঁরা ‘ওভারসিজ সার্ভিসের’ মাধ্যমে ঘরে বসেই নিজেদের আবেদনসহ অন্যান্য কাজ করতে পারবেন।