Image description

নিয়ম লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) বিভিন্ন পদে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিতে অস্বাভাবিক এবং নজিরবিহীন তৎপরতা চলছে। সরকারি নিরীক্ষায় ও শ্বেতপত্র কমিটি সংশ্লিষ্ট নিয়োগগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত কমিটি দ্বারা এসব অনিয়ম প্রমাণিতও হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ একাধিকবার লিখিতভাবে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশও দিয়েছে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং নিয়োগ নিয়ে আপত্তি থাকা কর্মকর্তারা পেতে যাচ্ছেন পদোন্নতি।

তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ পদোন্নতি কমিটির অধিকাংশ সদস্য সরাসরি আপত্তি জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিলেও কমিশন নিজস্ব আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির মতামতকে পাশ কাটিয়ে কমিশন কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে নিজস্ব কোর্ট রিটেইনার দুটি আইনি ফার্মের মতামত। ২৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ৩০৬তম কমিশন সভায় সেই মতামতের ভিত্তিতে পদোন্নতি কার্যকরের প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কমিশন সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বলছে, বিষয়টি উদ্বেগজনক।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ও এরই মধ্যে ব্যাপক আলোচিত কর্মকর্তার মধ্যে পরিচালক পদে চারজন এবং সিনিয়র সহকারী পরিচালক পদে একজন পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন। উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তারা হলেন সাবিনা ইসলাম, মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. রাইসুল ইসলাম এবং ড. শামসুজ্জোহা। এ ছাড়া সহকারী পরিচালক থেকে সিনিয়র সহকারী পরিচালক পদে পদোন্নতির তালিকায় থাকা কর্মকর্তার নাম শামসুল আলম। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মো. রাইসুল ইসলাম এবং ড. শামসুজ্জোহা এবং শামসুল আলম কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সরকারি নিয়োগবিধি উপেক্ষা করে প্রথমে ‘জুনিয়র পরামর্শক’ হিসেবে বিটিআরসিতে নিয়োগ পান।

অন্যদিকে সাবিনা ইসলাম এবং মো. দেলোয়ার হোসেনকে বিভাগীয় প্রার্থী দেখিয়ে নিয়োগ বিধি উপেক্ষা করে প্রকল্প থেকে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উভয়ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতামূলক লিখিত পরীক্ষা ব্যতিরেকে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে; যা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা সম্পর্কে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

জানা গেছে, ২০২০ সালে অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় বিটিআরসির বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। ওই নিরীক্ষায় বলা হয়, বিটিআরসির ২৯ জন কর্মকর্তার নিয়োগে চাকরিবিধি, নিয়োগ পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি। একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টেলিযোগাযোগ খাতের শ্বেতপত্র কমিটিও এ নিয়োগগুলোকে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত নিরীক্ষা ২০২০ সালে প্রকাশিত হলে বিটিআরসির নিয়োগে অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২১ সালে প্রথম তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং অনিয়মের প্রমাণ মেলে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আরও দুটি কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রতিবেদন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জমা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ পায়।

বিভিন্ন তদন্তে জুনিয়র পরামর্শকদের রাজস্ব খাতে, বয়স শিথিলতার অপব্যবহার এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিলেও সেটি উপেক্ষিত হয়। পরে ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে ৯টি নির্দেশনা দেওয়া হয়, যার ৭ নম্বরে বলা হয়—যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের পরও বিটিআরসি ব্যবস্থা নেয়নি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তৎকালীন সচিব আব্দুন নাসের খান কালবেলাকে বলেছিলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের পদোন্নতির সুযোগ নেই। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকবেন, ফলে অনিয়মের সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ একাধিকবার লিখিতভাবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিভাগটি বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ জবাব দিতে বলে। এর প্রায় দুই মাস পরে ১৪ ডিসেম্বর শ্বেতপত্র প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্বিতীয় চিঠিতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ফের অনুরোধ জানায়। কিন্তু কোনোটিই আমলে নেয়নি বিটিআরসি।

এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ২০২১ ও ২০২৪ সালে গঠিত তিনটি কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ২৯ জনসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে সাইনিং পাওয়ার রহিতের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে কমিশন তাদের সুবিধামতো ছয়জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ওএসডি করে শাস্তি কার্যকর করলেও এই ২৯ জনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ।

পদোন্নতিতে তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের ‘না’: কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভায় সরাসরি আপত্তি জানিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেন অধিকাংশ সদস্য। এমনকি কমিটির সদস্য সচিবসহ বিটিআরসির দুই কর্মকর্তাও অভিযুক্তদের পদোন্নতির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিটিআরসির কমিশন সভার কার্যবিবরণীতেই সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই আপত্তি একবার নয়, তিন দফায় উচ্চারিত হয়েছে। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি এবং ৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভায় সদস্যদের মতামতের ভিন্নতা দেখা যায়।

অভিযুক্তদের পদোন্নতির প্রোফাইলে উল্লিখিত অডিট আপত্তি কোনো ব্যক্তিগত অডিট আপত্তি নয় বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক আপত্তি—মর্মে মতামত প্রদান করেন কমিটির সভাপতি ও বিটিআরসি চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী এবং সংস্থাটির স্পেকট্রাম, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস এবং সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালকসহ চারজন। তবে কমিটির বাকি পাঁচ সদস্য এই মতামতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে স্পষ্ট মত দেন, ‘যেসব কর্মকর্তার প্রোফাইলে নিয়োগ-সংক্রান্ত অডিট আপত্তি রয়েছে, তাদের পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা যৌক্তিক নয়।’

অডিট আপত্তি থাকায় পদোন্নতিতে আপত্তি জানান বিটিআরসি ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিকসহ প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক ও সদস্য সচিব মো. মেহেদী উল-সহিদ, অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি নুরজাহান খানম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধি মো. সফিউল আলম এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এম. রায়হান আক্তার। তারা তাদের মতামতে বলেন, যেহেতু এই অডিট নিয়োগ-সংক্রান্ত, তাই যেসব কর্মকর্তার নিয়োগ প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত অডিট আপত্তি আছে, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের পদোন্নতির জন্য আপাতত বিবেচনা করা যৌক্তিক নয়, কেননা পদোন্নতি নিয়োগ এবং আর্থিক বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

অর্থাৎ সরকারের তিনটি মূল মন্ত্রণালয়—যারা বিধিগতভাবে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে ডিপিসিতে অংশ নেয়, সেই সঙ্গে খোদ কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ‘পদোন্নতি-সংক্রান্ত’ বিষয় যে বিভাগের আওতাভুক্ত সেই প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালকসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঁচজন সদস্য পদোন্নতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরেও পদোন্নতির প্রক্রিয়ার চলমান রেখেছে বিটিআরসি। এমনকি পদোন্নতি কমিটির বাকি সদস্যদের অবহিত না করে কমিশন সভায় পদোন্নতির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আপত্তির পরেও মন্ত্রণালয়ের কাছে নয়, বিটিআরসি সমাধান চাইছে নিজস্ব আইনি ফার্মে: কমিশন সূত্রে জানা গেছে, তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং মহাপরিচালকের (প্রশাসন) সম্মিলিত আপত্তির মুখে গত ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৩০৪তম কমিশন সভায় পদোন্নতি ‘নিয়োগ সম্পর্কিত অডিট আপত্তির সংশ্লিষ্টতা নিরূপণ সাপেক্ষে’ স্থগিত রাখা হয় এবং ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে এই ‘বিশেষজ্ঞ মতামত’ কী পদ্ধতিতে কার কাছ থেকে নেওয়া হবে, তা ডিপিসি সভায় সিদ্ধান্ত না নিয়ে এবং মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিলের ৩০৬তম কমিশন সভায় বিটিআরসি তার নিজস্ব কোর্ট রিটেইনার দুটি আইনি ফার্ম জাস্টিস এবং ক্যাপিটাল ল চেম্বারের কাছ থেকে সংগৃহীত মতামত পেশ করে। এই দুটি ফার্ম কমিশনের পক্ষেই আদালতে মামলা পরিচালনা করে এবং কমিশন কর্তৃকই নিযুক্ত। প্রত্যাশিতভাবেই দুটি ফার্ম কমিশনের অনুকূলে মত দিয়েছে।

তাদের মতামতের মূল বক্তব্য অডিট আপত্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত, ব্যক্তিগত অসদাচরণের নয়; কোনো সক্ষম কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ বাতিল না করায় তা বৈধ থাকে; ২০২২ সালের প্রবিধানমালার অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে পদোন্নতি দেওয়া যেতে পারে; এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত এই অডিট আপত্তি পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো ‘আইনি প্রতিবন্ধকতা’ নয়। তবে একই বিষয়ে মতামত দিতে কমিশন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়ার দ্বারস্থ হলে তিনি মৌখিকভাবে মতামত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩০৬তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রশাসন বিভাগকে ‘বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম’ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, এই নির্দেশের আড়ালে মূলত অফিস আদেশের মাধ্যমে ওই চার কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে পদোন্নতির প্রস্তুতি চলছে। ওই অপপ্রয়াস সফল হলে পরে এ-সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা সৃষ্টি হবে, যার ভুক্তভোগী হবেন পরবর্তী ধাপের কর্মকর্তারা।

বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সদস্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে যুগ্ম সচিব মো. সফিউল আলম কালবেলাকে বলেন, অডিট আপত্তি থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়ে তারা দ্বিমত পোষণ করেছিলেন এবং নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলেন। তারপর কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের কাজ ছিল আইন যা বলে তা উপস্থাপন করা। যদি কেউ আইন লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেয়, তবে সেটি সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা হিসেবে গণ্য হবে। বিশেষজ্ঞ মতামতের বিষয়ে কিছু জানেন না বলেও জানান তিনি।

হাইকোর্টের রুল: জবাব নেই, পদোন্নতির তোড়জোড় বহাল: বিটিআরসিতে কর্মরত ছয় উপপরিচালক সজিব কুমার সিংহ, কাজী মো. আহসানুল হাবীব মিথুন, মো. জাকির হোসেন খান, এসএম আফজাল রেজা, মো. আসিফ ওয়াহিদ এবং মো. হাসিবুল কবির মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এসএফআই তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতি না দেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠান। সাড়া না পেয়ে তারা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। শুনানি শেষে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ৫ মার্চ রুল জারি করেন।

রুলে তিনটি বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে; মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে ব্যবস্থা না নেওয়া কেন অবৈধ হবে না; কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না; এবং ৩ নভেম্বরে গঠিত ডিপিসির কার্যক্রম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। দুই সপ্তাহের মধ্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক (প্রশাসন), ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব এবং অডিট উইংয়ের যুগ্ম সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেছে কেউ এখন পর্যন্ত জবাব দাখিল করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে ৩১ মার্চ রিটকারী ছয় উপপরিচালকের মধ্যে সঞ্জিব কুমার সিংহ ও এস এম আফজাল রেজাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে রংপুর ও সিলেটে স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনে সংযুক্ত করা হয়, যা সরকারের অনুমোদনবিহীন এবং ওই স্টেশনগুলোতে উপপরিচালকের কোনো পদ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। আদেশের ব্যাখ্যা চাইলে কমিশন তা স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়, ফলে তারা ফের রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ এপ্রিল হাইকোর্ট তাদের বদলির আদেশ স্থগিত করে রুল জারি করেন এবং বর্তমানে ওই দুই কর্মকর্তা প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত আছেন।

কর্মকর্তারা আরও অভিযোগ করেন, ডিপিসি সভা জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হলেও ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত যারা পদোন্নতিযোগ্য তাদেরকেই বিবেচনা করা হয়েছে। শুধু পরবর্তী ব্যাচ যারা ১০ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পদোন্নতিযোগ্য হয়েছে, তাদের বাদ দেওয়ার জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রশাসনিক বিরোধে আইনি মতামতের চেয়ে প্রশাসনিক মতামত সবসময় অগ্রগণ্য। এক সাবেক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনটি মন্ত্রণালয় পদোন্নতির বিরুদ্ধে, অডিট আপত্তি রয়েছে, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় পত্র দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বারবার বলছে, দুদক ও এ বিষয়ে নথিপত্র পর্যালোচনা করছে। তবু প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে অথবা অডিট দপ্তরের কাছে না গিয়ে নিজেদের নিয়োগকৃত আইনজীবীর কাছ থেকে পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠান কমিশনের পক্ষে মামলা লড়ে, তারা কখনো কমিশনের বিরুদ্ধে মতামত দেবে না এটাই স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, কমিশন কি নিরপেক্ষ মতামত চাইছে, নাকি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার জন্য কাগজ জোগাড় করছে?’

নিয়োগ নিয়ে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতির বিষয়ে গত কয়েকদিন যোগাযোগের চেষ্টা করেও বিটিআরসির কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভাইস চেয়ারম্যান ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য মো. আবু বকর ছিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে বিটিআরসির প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক ও পদোন্নতি কমিটির সদস্য সচিব মো. মেহেদী উল-সহিদের যোগাযোগ করা গেলেও এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, বরং চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

তবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ও পদোন্নতি কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল এবং তার হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে মেসেজ দিয়েও সাড়া মেলেনি। এমনকি সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

সার্বিক বিষয়টি অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি কালবেলাকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এমনটি হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।