মানুষ যতো বড় হয় ততোই তার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। কারণ বড় হওয়ার পর অনেকেই আসেন ছেলেবেলার কথা জানতে। কীভাবে বড় হলাম। কেমন কেটেছে ছেলেবেলার দিনগুলো- এরকম নানা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আর তখনই স্মৃতি ভেসে ওঠে। মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা। মানুষ বড় হলে ছোটবেলার কথা বলতে ভালোবাসে, ভালোবাসে স্মৃতিচারণ করতে। মানুষই একমাত্র জীব যাদের ছেলেবেলার কথা মনে থাকে। মানুষ ছোট থেকে বড় হয়। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছে যায়। এই যৌবনে মানুষ সব কাজ করতে পারে। জীবন গড়ার সময় এটি। যুবক বয়সে মানুষ যদি তার পথ থেকে ছিন্ন হয় তাহলে আর কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে না। এটা গবেষণার বিষয়।
ধরে নিলাম বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের কথা। তার সম্পর্কে পড়েছি। তিনি ঘরের ভেতরে যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেন দুই ঘরের মাঝে আরেকটি ছোট দরজা ছিল। তিনি একদিন ঘরে প্রবেশ করার সময় দেখেন ছোট দরজাটা তো নেই, আমি কীভাবে ঘরে প্রবেশ করবো? বড় দরজা যে রয়েছে সেটা দিয়েও তো ঘরে প্রবেশ করা যায় এটা তার মাথায় নেই। এত বড় বিজ্ঞানী যখন তার ছেলেবেলার গল্প বলেছেন তখন এভাবেই অকপটে স্বীকার করেছেন তার সরলতার কথা। নিউটনেরই আরেকটি গল্প আমরা শুনেছি। গ্রামের বাড়িতে নিউটনদের একটি ফলের বাগান ছিল। প্রচলিত গল্পমতে, একদিন সেই বাগানের আপেল গাছের নিচে বসে নিউটন গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। হঠাৎ একটি আপেল খসে পড়ে মাটিতে। এই একটি ঘটনাই নাকি খুলে দিয়েছিল নিউটনের তৃতীয় নয়ন। তার মাথায় প্রশ্ন জাগে, আপেল কেন মাটিতে পড়ে? কেন উপরে উঠে যায় না? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই নাকি তিনি মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেন। এই গল্পটা তিনি বলেছিলেন জীবনের শেষদিকে এসে।
আবার নিউটনের মাথায় যদি ডাব পড়তো তাহলে তো তিনি পৃথিবী ত্যাগও করতে পারতেন। বিজ্ঞানের ভাষায় ইউরেকা মোমেন্ট রয়েছে। একবার গ্রিসের সিরাকিউজ দ্বীপের রাজা একটা সোনার মুকুট নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, সেটা খাঁটি না ভেজাল। উপায় না পেয়ে তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসকে ডেকে পাঠান এবং নির্দেশ দেন, মুকুট না গলিয়েই এর বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করতে হবে।
আর্কিমিডিস সপ্তাহখানেক ভাবনা-চিন্তার পর বাথটাবে গোসল করতে গিয়ে হঠাৎ সমাধান পেয়ে যান। তিনি লক্ষ্য করেন, পানিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাথটাব থেকে পানি উপচে পড়ছে। এই উপচে পড়া পানি দেখেই তিনি আবিষ্কার করেন তার বিখ্যাত সূত্র, বস্তুর আপেক্ষিক গুরুত্ব। উত্তেজনায় তিনি ‘ইউরেকা!’ ‘ইউরেকা!’ বলে চিৎকার করতে করতে রাজ দরবারে ছোটেন। এই ঘটনাটিই এখন বিজ্ঞান জগতে ইউরেকা মোমেন্ট নামে পরিচিত। বড় বড় মানুষদের নিয়ে এরকম অনেক গল্প আছে। এসব গল্পের সত্য-মিথ্যা থাকতে পারে। হতে পারে কোনো কোনোটা মিথ। আমরা অনেক সময় বিস্মিত হই। আমরা বিখ্যাত ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের জীবনীতে পাই কী পরিমাণ দুষ্টু ছিলেন তিনি। সেই দুষ্টু ছেলেটিই পৃথিবীর বিখ্যাত ক্রিকেটার হয়েছিলেন।
ছোটবেলার সঙ্গে বড়বেলার যেমনি মিল হয় না, তেমনি বড়বেলাকে ছোটবেলায়ও আবদ্ধ রাখা যায় না। আমরা বড় হলে মুরুব্বি কারও কাছ থেকে শুনি যে অমুক ছোটবেলা থেকেই এমন। বোঝা যাচ্ছিল, সে বড় হয়ে এরকম হবে-আসলেই কী তাই? তবে আমরা ছোটদের যদি এখন থেকেই স্বাপ্নিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে তারা জীবনে অবশ্যই অনেক বড় হবে। বাংলাদেশটা আয়তনে ছোট হতে পারে কিন্তু এখানকার মানুষের মন অনেক বড়। তৃতীয় বিশ্বের এই উন্নয়নশীল দেশটি অনেক সম্ভাবনাময় দেশ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে দেশ বিশ্ব মানচিত্রে আসন গড়েছে সেই দেশ নিয়ে তো আমরা অনেক কিছুই ভাবতে পারি। অনেকেই বলেন, আমাদের অতিরিক্ত জনসংখ্যা-কিন্তু এই জনসংখ্যাই তো আমাদের শক্তি। এই জনসংখ্যাকে যদি আমরা ‘জনশক্তি’তে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে আমাদের উন্নয়ন ঠেকাবে সাধ্য কার।
আমাদের রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে আবাদি জমি। রয়েছে বিশ্বের বড় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। আরেকদিকে প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। আমরা যদি এগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি তাহলে এই ছোট্ট সুজলা-সুফলা বাংলাদেশও বিশ্বের বুকে উন্নত দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। আর এই কাজটি করতে হলে আমাদের শিশুদের মনে এটা গ্রথিত করে দিতে হবে। আজ এই মুহূর্ত থেকে যদি আমরা শিশুদের প্রতি যত্নবান হই, তাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে ভাবতে শেখাই বোঝাতে শেখাই যে এই দেশটা তোমার দেশ, তুমিই এই দেশকে সুন্দর করে সাজাবে। তাহলে তারাই হবে আমাদের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। দেশে তখন যুদ্ধ চলছিল। আমরা যারা একাত্তরে যুদ্ধ করেছি। দেখেছি এদেশের মানুষ প্রতিকূল আবহাওয়াতে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করে। কীভাবে ঝড় বাদলে টিকে থাকে। সেই মানুষগুলোকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে আমরা পিছিয়ে থাকবো কেন? একাত্তরে আমরা বিরূপ পরিবেশে ঈদ উদ্যাপন করেছি। তখন আমাদের মনে ভয় সংশয় ছিল আবার ঈদের আনন্দও ছিল।
আমাদের ছেলেবেলায় ঈদের আনন্দ ছিল একটু অন্যরকম। এখনকার এই ভার্চ্যুয়াল জগৎ ছিল না। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল একেবারেই আত্মিক। এখন কিছুটা কৃত্রিমতা আমাদের ঈদ উদ্যাপনে যুক্ত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম এখন ভিন্নভাবে ঈদ উদ্যাপন করে। হয়তো আরও আড়ম্বরপূর্ণভাবে। ঈদ উদ্যাপনে যেমন আমরা একত্রিত হই। আনন্দ ভাগাভাগি করি সেভাবেই আমাদের শিশুদের বোঝাতে হবে যাতে তারা ছোটবেলা থেকেই বিষয়টি বুঝতে পারে যে, দেশটা আমাদের সকলের অহঙ্কারের। আমরা যেখানেই থাকি, যে অবস্থাতেই থাকি আমরা যেন আমাদের দেশ নিয়ে ভাবি। আমাদের ভাবনায় যেন থাকে সবার আগে বাংলাদেশ।