বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার পথ যে অনেক কঠিন, তা আওয়ামী লীগ বুঝতে পারছে। তাই দলটি নতুন করে নিজেদের গোছানোর চেষ্টা করছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে এখন তারা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
দলের ভেতরে গতি আনার জন্য নেতা-কর্মীরা ইদানীং কিছু বৈঠক ও মিছিল করছেন। শীর্ষ নেতারা অনলাইন গ্রুপ ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। শুরুতে অনেক বড় নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বা আত্মগোপন করেন। এখন প্রবাসে থাকা এই নেতারা আবার কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দলটি বড় আইনি সংকটে পড়ে। ২০২৫ সালের ১২ মে সরকার এক প্রজ্ঞাপনে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের সব রাজনীতি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে।
এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ সংশোধন করা হয়। এই নতুন আইন পাস হওয়ার পর দলটির রাজনীতি করার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে দলটির প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করার সুযোগ আর নেই।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আওয়ামী লীগের জন্য সাধারণ কোনো বিপর্যয় নয়। এটি তাদের টিকে থাকার লড়াই। একদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তীব্র বিরোধিতা দলটিকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
দলের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অতীতে গুম ও খুনের ঘটনায় জড়িত শীর্ষ নেতাদের ওপর তৃণমূলের কর্মীরা ক্ষুব্ধ।
লেখক ও ইতিহাস গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, আওয়ামী লীগকে আগে ঠিক করতে হবে তারা কীভাবে রাজনীতিতে ফিরবে। নির্বাসন থেকে শীর্ষ নেতারা যে কড়া বক্তব্য দিচ্ছেন, দেশের কর্মীরা তা ভালো চোখে দেখছেন না।
তিনি আরও বলেন, দলটির ঘুরে দাঁড়ানো এখনো অনেক দূরের বিষয়। মাঠে কে নেতৃত্ব দেবে, তা পরিষ্কার নয়। শুধু অনলাইন গ্রুপ বা দু-একটি ঝটিকা মিছিল মানেই রাজনীতিতে ফেরা নয়। দলটিকে মূলধারায় ফিরতে হলে অতীতের ভুল ও জবাবদিহিতা নিয়ে দলের ভেতরে বড় সংস্কার করতে হবে।
আইন পাসের পর কড়া নজরদারি
সংসদে নতুন আইন পাসের পর আওয়ামী লীগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। রাষ্ট্রবিরোধী কাজ, সহিংসতা ও গণহত্যার জন্য যেকোনো সংগঠন নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা এখন সরকারের হাতে।
আইনের কারণে দলটির পক্ষে কোনো জনসভা, মিছিল বা কার্যালয় চালানো অসম্ভব। সরকারি সূত্রমতে, নিষিদ্ধ এই দলকে আবার বাঁচিয়ে তোলার যেকোনো চেষ্টা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। এমন কোনো চেষ্টা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে দেওয়া হবে।
গোপন তৎপরতা
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা এবং ঢাকার কিছু এলাকায় সাবেক আওয়ামী লীগ কর্মীরা গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক নেতারা বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট অনানুষ্ঠানিক কমিটি করছেন। ধরা পড়ার ভয়ে তারা সরাসরি দেখা না করে নিরাপদ অনলাইন গ্রুপে যোগাযোগ রাখছেন। বড় কোনো মিছিল না করে তারা এখন বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কর্মীদের সক্রিয় করার কৌশল নিয়েছেন।
মিছিল ও গ্রেপ্তার
সম্প্রতি খুলনার জিরো পয়েন্টে আওয়ামী লীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে ১১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর আগে এপ্রিলে যশোরে গোপন বৈঠক করার অপরাধে পাঁচজন সাবেক এমপিসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।
সারাদেশেই দলটির এমন চেষ্টা বন্ধ করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নোয়াখালীতে মিছিলের চেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর অভিযোগে বেশ কয়েকজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিনকে পদযাত্রার চেষ্টা করার সময় গ্রেপ্তার করা হয়।
বিএনপির অবস্থান পরিবর্তন
আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি শুরুতে কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছিল। তবে সংসদে দলটিকে নিষিদ্ধ করার পর বিএনপির অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে। তারা এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিরোধিতা করছে।
বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগ ফিরে এলে তা তাদের ক্ষমতার জন্য বড় হুমকি হবে। তাই তারা সরকারের কঠোর দমননীতিকে সমর্থন করছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ‘টাইমস’কে বলেন, আওয়ামী লীগ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে এবং গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে। তাই তাদের যেকোনো ফেরার চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।
জামায়াত ও এনসিপির শক্ত বাধা
বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা জামায়াতে ইসলামী এবং নতুন দল এনসিপি। তারা চায় এই স্বৈরাচারী দলটির নির্বাসন যেন স্থায়ী হয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়ের ‘টাইমস’কে বলেন, দলটি নিষিদ্ধ ও এর নেতারা গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি। জনগণ তাদের আর রাজনীতি করতে দেবে না। পেছনের দরজা দিয়ে ফেরার চেষ্টা করলে মানুষ তা রুখে দেবে। এনসিপির যুগ্ম প্রধান সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, গুম ও অর্থ পাচারে জড়িত দলের গণতন্ত্রে আসার কোনো অধিকার নেই।
তৃণমূলের হতাশা
আওয়ামী লীগের ভেতরে এখন বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বের দূরত্ব। শীর্ষ নেতারা বিদেশে বা আত্মগোপনে থেকে শুধু ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল চালাতে চাইছেন।
মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এই ‘রিমোট কন্ট্রোল’ নেতৃত্ব পছন্দ করছেন না। দলের ভেতরের অনেকেই বলছেন, বিতর্কিত ও অভিযুক্ত নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নিয়ে দল সংস্কার করা উচিত।
তবে প্রবাসে থাকা শীর্ষ নেতারা এই পরিবর্তনের বিপক্ষে। তারা এখনো শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই দল ধরে রাখতে চান। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ‘টাইমস’কে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তারা এখন কর্মীদের নিরাপদে রেখে ধীরে ধীরে কাজ করছেন।
তিনি আশা করেন, একসময় গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্বার্থেই সরকার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে।