Image description

রামিসার শ্রেণিকক্ষে গিয়েছিলেন বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। ফুটফুটে মেয়েটি যে শ্রেণিকক্ষে প্রতিদিন বসতো সেখানে বসে তিনি মেয়ের স্মৃতি হাতড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রামিসার সহপাঠীদের জড়িয়ে ধরে তার কান্নার দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অনেকে। আব্দুল হান্নান মোল্লার সঙ্গে রামিশার সহপাঠীদের কান্নার হৃদয়ছেঁড়া দৃশ্য বাকরুদ্ধ করেছে অনেককে। মিরপুরের পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসাকে মঙ্গলবার ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যা করে সোহেল রানা নামের এক পাষণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে সারা দেশে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আসছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে রামিসার সহপাঠীরাও রাস্তায় নেমেছেন। গতকাল বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা যখন ওই বিদ্যালয়ে যান তখন রামিসার ছোট্ট সহপাঠীদের আপ্লুত ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রামিসার এক সহপাঠী হামিদা বলে, আমি আমার বান্ধবীকে হত্যার বিচার চাই। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি। সে বলে রামিসা সোমবারও স্কুলে এসে আমাকে আইসক্রিম খাইয়েছিল। আমরা সব সময় একসঙ্গে বসতাম। এখন আমি আমার বান্ধবীকে কোথায় পাবো? যে মেরেছে আমি তার ফাঁসি চাই। কাঁদতে কাঁদতে রামিসার আরেক সহপাঠী বলে, ‘ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। সব সময় আমার সঙ্গেই বসতো। এখন আমার পাশে কে বসবে? ওর জন্য খুব মন খারাপ লাগে। আমরা আর কোনোদিন রামিসাকে পাবো না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্লাসে সকলের মধ্যে কখনো প্রথম, কখনো দ্বিতীয় হয়েছে রামিসা। ওর পুরস্কারগুলো এখনো আমাদের এখানে রয়েছে। খুবই মেধাবী ও ভদ্র একটা মেয়ে ছিল। ওর সঙ্গে এমনটা হবে আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।
এদিকে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সারা দেশ। এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে ‎বৃহস্পতিবার সকালে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ করেছে তার সহপাঠী ও এলাকাবাসী। এ সময় দ্রুত বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান- তারা।

পরে মিছিল নিয়ে তারা পল্লবী থানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে থানার ভেতরে ঢুকে পড়েন তারা। রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘাতক সোহেলের ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছে স্থানীয়রা। বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর মিরপুর-১০ থেকে ১২ নম্বর সড়কে এই বিক্ষোভ হয়। এতে পুরো মিরপুর এলাকার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয় যায়। বিক্ষোভে অংশ নেয়া সামিউল হক নামের একজন বলেন, ৭ দিন নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফাঁসি দিতে হবেÑ এটাই আমাদের দাবি। বাংলাদেশে অনেক বিচার হয় না। এজন্য আমরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে চাই না।
রামিসা হত্যার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনও। গতকাল বিকালে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ছায়ানটের ছাত্র-শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠানটির সামনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সাইনবোর্ড, প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে বিক্ষোভ করেন। তারাও খুনি সোহেল রানার সর্বোচ্চ বিচার দাবি করেন।

নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদ, অপরাধীদের দ্রুত বিচার এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় শিশুকিশোর সংগঠন ‘ফুলকুঁড়ি আসর’। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন সমাবেশে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের মহিলা বিভাগও। রামিসা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান তারা। রামিসার গ্রামের বাড়িতেও ‎‎অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি তোলা হয়েছে। শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে নোয়াখালীতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে নোয়াখালীর সর্বস্তরের জনগণের ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি এ ঘটনাকে শুধু আইন ভঙ্গ নয়, বরং মানবতার নির্মম হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

অপরদিকে রামিসা হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত ঘাতক সোহেল রানার গ্রামের বাড়ি নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেশচন্দ্রপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামেও মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। তার বাবা, বোনসহ এলাকাবাসী সোহেলের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন। স্থানীয়রা বলেন, প্রায় ১৪ বছর আগে মহেশচন্দ্রপুর বাজারে একটি ছোট সাইকেল মেরামতের দোকানে কাজ শুরু করতো সোহেল। একপর্যায়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। পরে জুয়া, চুরি ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় হাটবাজার ও বাড়িতে দিনমজুরির আড়ালে চুরির অভিযোগে সে একাধিকবার ধরা পড়ে। ছেলেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সোহেলের বাবা তাকে বিয়ে দেন। কিন্তু সংসার জীবনে প্রবেশের পরও সে বদলায়নি। জুয়া ও ঋণের কারণে পারিবারিক অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং পরে ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ওই ঘটনায় পরিবারের সঙ্গে বিরোধ চরমে পৌঁছালে ২০২৩ সালে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তার বাবা। এরপর সে ঢাকায় চলে আসে।

রামিসা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ঘাতক সোহেলের বোন জলি বেগম বলেন, তিন বছর আগে বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। আমরা জানতাম না সে এত ভয়ঙ্কর অপরাধ করতে পারে। আমরা তার কঠোর শাস্তি চাই। সোহেলের বাবা জাকির আলী বলেন, আমি তাকে বহু আগেই বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। সে যে শিশু হত্যার মতো জঘন্য কাজ করেছে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। বাবা হিসেবে আমি তার লাশও দেখতে চাই না।

বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল ও তার সহযোগী স্ত্রীকে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। সম্ভাব্য সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে এ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। ওদিকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নৃশংস ঘটনার বিচারকাজ সম্পন্ন করতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের এভিনিউ-৭ এর ৩৭ নম্বর ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ওই বাসার বাথরুমের ভেতর থাকা বালতির মধ্য থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় ঘাতক সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোহেল ধর্ষণের পর রামিসাকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।