চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ও অভিযুক্তকে আটক করা নিয়ে ঘটেছে তুলকালাম কাণ্ড। এলাকার শত, শত মানুষ ছয় ঘন্টারও বেশিসময় ধরে সড়কে অবস্থান নিয়ে করছে বিক্ষোভ। ‘ধর্ষককে’ তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে জনতা।
পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনতার দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ছুঁড়লে পুরো এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে।
রাত ১০টা পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। পুলিশও আসামি নিয়ে থানায় যেতে পারেনি। তবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে পাঠানো হয়েছে ভুক্তভোগী শিশুকে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর বাকলিয়া থানার চরচাক্তাই নুর চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকার বাসিন্দা শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করে এলাকাবাসী। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ওই ব্যক্তিকে নেয় নিজেদের হেফাজতে। তাকে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার আগেই শত, শত মানুষ রাস্তায় নেমে অবরুদ্ধ করে ফেলে পুরো এলাকা।
ঘটনাস্থলে থাকা বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কিশোর মজুমদার আগামীর সময়কে বলেন, ‘হঠাৎ করে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে গেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা থানায় যাচ্ছিলাম। আমাদের গাড়ি আটকে দিয়েছে। পরে আমরা তাকে এলাকায় একটি ভবনের ভেতরে নিরাপদ স্থানে নিয়ে রাখি। আমরা ভবনের গেইটের সামনে অবস্থান নিয়েছি।’
পুলিশের তথ্য, আটক ব্যক্তির নাম মনির। বয়স প্রায় ৪০ বছর। চরচাক্তাই এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজের কর্মচারী তিনি।
আক্রান্ত শিশুটির স্বজনদের ভাষ্য, দুপুরে শিশুটিকে ফুসলিয়ে মনির বাসার পাশের একটি ডেকোরেশনের দোকানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করেন তিনি। পরে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে ফিরে তার নানাকে ঘটনা জানায়। নানাসহ আরও কয়েকজন ডেকোরেশনের দোকানে গিয়ে মনিরকে আটক করেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, আটক মনির সাংবাদিকদের বলছেন, ‘আমি স্বীকার করছি আমি কাজটা করেছি। আমাকে শয়তানে পেয়েছিল।’
এসআই কিশোর মজুমদারের ভাষ্য, ‘আমরা এখনও ঘটনার কিছুই তেমন জানি না। শুধুমাত্র ধর্ষণের অভিযোগে একজনকে এলাকাবাসী আটক করেছে শুনেই এসেছিলাম। এরপরই তো উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগও পাইনি।’
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আটক মনিরকে থানায় নেওয়ার সময় গাড়ি আটকে দিয়ে এলাকার নারী-পুরুষ, কিশোর-তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী শত, শত মানুষ রাস্তায় এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। আক্রান্ত শিশুর স্বজন এক নারী বলেন, ‘এইদেশে কোনো বিচার নাই। ছোট ছোট মেয়েদের ধর্ষণ করছে। আমার নাতনিকে ধর্ষণ করছে। আমি ফাঁসি চাই। আমি নিজে তারে ফাঁসি দিতে চাই।’
কামরুজ্জামান নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘মাত্র সাড়ে তিন বছরের একটা বাচ্চা। তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। আমরা তাকে নিয়ে যেতে দেব না। পুলিশ বলছে তারা বিচার করবে। বিচার আমরাই করব। তাকে আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক।’
এ পরিস্থিতিতে রাত ৮টার পর শতাধিক অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। র্যাবের টিমও সেখানে পৌঁছে। জনতাকে সরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ শুরু করে। বিক্ষুব্ধ জনতা তখন পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। তারা ভুয়া, ভুয়া স্লোগান দিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।
এরপর থেকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আশপাশের এলাকা থেকেও লোকজন ঘটনাস্থলে জড়ো হচ্ছে। পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষসহ অন্তত ২০ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিন পত্রিকার সাংবাদিক মামুন আবদুল্লাহ ও নোবেল হাসানকে ভর্তি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
এসআই কিশোর মজুমদার বলেন, ‘হাজার, হাজার মানুষ পুলিশের ওপর আক্রমণ শুরু করে। এ সময় পুলিশকে আত্মরক্ষার্থে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। সিনিয়র স্যারেরা ঘটনাস্থলে আছেন। স্যারদের নির্দেশক্রমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’