দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি চলতি বছরের মার্চে নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। একসময় দুই অঙ্কের ঘরে থাকা এই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত পতন নয়, বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ প্রবাহে একটি গভীর সংকেত।
প্রত্যাশা ছিল ঘুরে দাঁড়ানোর, বাস্তবতা বিপরীত
জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরবে—এমন একটি প্রত্যাশা ব্যবসায়ী মহলে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের পরও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। বরং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই স্থগিত হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চ সুদহার, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ মিলিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ এখনও অনুকূল নয়।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব
বিশ্ব অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতা—বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং জ্বালানি বাজারের ওঠানামা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও কাঁচামালের দামের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বাড়িয়েছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ কমেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অস্থির বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে কেউই বড় বিনিয়োগে যেতে চাইছে না।”
উচ্চ সুদহার ও ব্যাংকিং খাতের রক্ষণশীল অবস্থান
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ সুদহারকে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে ব্যাংকঋণের গড় সুদহার প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিনিয়োগের জন্য বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “সুদের উচ্চ হার শুধু নতুন ঋণকেই নয়, বিদ্যমান ব্যবসার খরচও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।”
অপরদিকে ব্যাংকগুলোও তুলনামূলক নিরাপদ খাতে—বিশেষ করে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।
ব্যাংক খাতের ভেতরকার সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। অনেক ব্যাংক এখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, ব্যাংকিং খাত এখন “রক্ষণাত্মক অবস্থানে” চলে গেছে। তার ভাষায়, “ঝুঁকি বাড়ায় ব্যাংকগুলো নতুন বিনিয়োগে অংশ নিতে অনাগ্রহী, আবার উদ্যোক্তারা আস্থাহীনতায় ভুগছেন—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে।”
দ্বিমুখী সংকট: চাহিদা ও সরবরাহ দুটোই দুর্বল
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অর্থনীতি এক ধরনের দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে—একদিকে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগের চাহিদা কম, অপরদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ সরবরাহ সক্ষমতাও সীমিত।
এই অবস্থাকে অনেক অর্থনীতিবিদ “নিম্ন-ভারসাম্যের ফাঁদ” হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে বিনিয়োগ না বাড়ায় উৎপাদন স্থবির হচ্ছে, আর উৎপাদন স্থবির থাকায় নতুন ঋণের প্রয়োজনও কমে যাচ্ছে।
নীতিগত অনিশ্চয়তা ও কাঠামোগত সমস্যা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টর মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং আস্থার ঘাটতি—সব মিলিয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।’’ তবে তিনি এটিও মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে সীমিত হলেও স্থিতিশীল ঋণ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
সরকারি ঋণ ও বেসরকারি খাতের চাপ
অর্থনীতিবিদদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো, ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণের চাপ বৃদ্ধি। সরকারি ঋণ বেশি নিরাপদ হওয়ায় ব্যাংকগুলো সেই খাতে বেশি ঝুঁকছে, ফলে বেসরকারি খাত তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ প্রবাহ কমে গিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি হারাচ্ছে।
সামগ্রিক চিত্র: স্থবিরতার ঝুঁকি
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন একটি অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে নতুন বিনিয়োগ কমছে, ব্যাংকঋণ বিতরণে সতর্কতা বাড়ছে, উৎপাদন ও আমদানি ধীরগতিতে যাচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের গতি দুর্বল হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উত্তরণের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামানো। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি কাঠামো তৈরি। এসএমই ও উৎপাদন খাতে সহজ শর্তে ঋণ সম্প্রসারণ। নীতিগত আস্থার পুনর্গঠন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল আর্থিক নীতি নয়, বরং সামগ্রিক আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির এই পতন তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি দেশের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের গতিপথ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।