Image description

একসময় চট্টগ্রাম শহরে ছাত্ররাজনীতি করতেন। যোগাযোগ ছিল অপরাধজগতের কারও কারও সঙ্গে। কিছুটা জড়িয়েও পড়েছিলেন নিজেও। ভুল উপলব্ধি করতে পেরে দ্রুত ফেরেন এ জগৎ থেকে। পাড়ি জমান কাতারে। সেখানে বাবার সঙ্গে থাকতেন। ছেলে কাজ করতেন কাতার আর্মিতে। সুদর্শন ও সুঠামদেহী এই যুবক হঠাৎ প্রেমে জড়ান কাতারের শেখ পরিবারের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে। বাবা জানেন কাতারের আইন খুব কড়া। বেঁচে থাকাই কঠিন হবে বাপ-ছেলের। তাই ছেলেকে জোর করে পাঠিয়ে দেন ইউরোপে।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের মহসিনের নিয়মিত বসবাস এখন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর শহর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। তিন মেয়ে, এক ছেলে ও ফরাসি মুসলিম স্ত্রী নিয়ে তাদের সুখের সংসার। বড় মেয়ে ডাক্তার, মেজো মেয়ে ব্যারিস্টারি পড়ছেন, ছেলে ইউনিভার্সিটিতে ও ছোট মেয়ে কলেজে। জেনেভার রেলস্টেশনের পাশে খাবার, গ্রোসারি, সুপারস্টোরসহ পাঁচ ধরনের ব্যবসা রয়েছে তার।

সুইজারল্যান্ডের নাগরিক এখন। ফ্রেঞ্চ, ইংলিশ, ফারসি, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন তিনি।

কোরবানির ঈদ এলেই মহসিন চলে আসেন জন্মশহর চট্টগ্রামে। থাকেন ১৫ দিন। কোরবানি করার জন্য আসেন না তিনি। আসেন কোরবানির পশু বিক্রির জন্য। এটি তার বাংলাদেশের ব্যবসা। যেনতেন গরু নয়। বিশাল সাইজের আমেরিকার ক্রস ব্রাহামা প্রজাতির, পাকিস্তানের পাঞ্জাবের শাহিওয়াল, পাকিস্তানি প্রজাতির বিশাল আকৃতির মহিষ। একেকটি গরুর দাম ৩ থেকে ১১ লাখ টাকা। ৩০০ থেকে ৯০০ কেজি পর্যন্ত ওজন।

শখের বশেই মোহাম্মদ মহসিনের এ উদ্যোগ। বাড়ির পাশে জায়গা কিনে গড়ে তুলেছেন শেড। পরিপাটি সেই শেডে গরু রাখা হয়। খাবার দেওয়া হয় অর্গানিক। ওজন বাড়ানোর জন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো হয় না। সৎভাবে আয় করার লক্ষ্য নিয়েই তার এ ব্যবসা। নাম রেখেছেন মায়ের নামে। ‘আছিয়া অ্যাগ্রো ফার্ম’। মায়ের বয়স ৯৫। এখনো চলতে-ফিরতে পারেন। বাংলাদেশে এলে নিজে রান্না করে খাওয়ান ছেলেকে।

চট্টগ্রামে এসেই ৮ লাখ টাকায় তিনটি গরু বিক্রি করেছেন এক দিনে। মহসিন বললেন, ‘৫৫টি তরতাজা বিশাল সাইজের গরু রয়েছে খামারে। যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। সব বিক্রি করব না। কিছু রেখে দেব আগামী বছরের জন্য। বড় হবে, দামও পাব।’

গরু বিক্রির লাভের টাকা সুইজারল্যান্ডে নিয়ে যান না। দেশেই বিনিয়োগ করেন। ১০ বছর আগে খামার ব্যবসা শুরু করার সময় সুইজারল্যান্ড থেকে টাকা নিয়ে এসেছিলেন। প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল কোটি টাকা। এখন খামারের জায়গা, শেড নির্মাণ, গরু কেনা বাবদ মোট বিনিয়োগ ২০ কোটি টাকার ওপর। সুইজারল্যান্ডের মতো উচ্চ আয়ের ও ছবির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ থেকে কেন চট্টগ্রামে এসে এই ব্যবসা? জবাব দিলেন সাবলীলভাবে, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। প্রথম ১০ বছর চাকরি করতে হয়েছে সুইজারল্যান্ডে। এখন নিজের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের স্টাফ আছে ৩৫ জন। ব্যবসা মানে ব্যবসা। দেশ-বিদেশ বলে কোনো কথা নেই। দেশে কম সময়ে লাভজনক ব্যবসা করা যায় বলেই প্রতি বছর চলে আসি। ভাবতে ভালো লাগে— একসময়ের বেকার মহসিনের দেশেও চলছে ব্যবসা আবার বিদেশেও। দেশে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই বেকারদের জন্য।’