Image description
খুনির স্বীকারোক্তি

রামিসা আক্তার। পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আবদুল হান্নান মোল্লা ও পারভীন আক্তার দম্পতির চোখের মণি ছিল ৮ বছর বয়সী এই রামিসা। হাসি-ঠাট্টা, গল্প, বায়না- কোনো কিছুরই যেন কমতি ছিল না সংসারে। 

কিন্তু মঙ্গলবার সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে ফুটফুটে শিশুটির সঙ্গে যা হয়েছে তা দেখে হতভম্ব পুরো দেশ। ক্ষুব্ধ, বাকরুদ্ধ মানুষ। রামিসার বাবা-মায়ের কান্না থামানোর যেন কোনো ভাষা নেই। শোকার্ত ক্ষুব্ধ পিতা আহাজারি করে বলছেন, বিচার চেয়ে কি লাভ, আমার রামিসা তো আর ফিরবে না। কী হবে বিচার চেয়ে। কয়েকদিন পর সবাই ভুলে যাবে। ওদিকে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের এভিনিউ-৭ এর ৩৭ নম্বর বাসার তিনতলায় উত্তর পাশের রুমের ভেতর থেকে রামিসা আক্তারের মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ওই বাসার বাথরুমের ভেতর থাকা বালতির মধ্য থেকে মাথা উদ্ধার করা হয়। রামিসার মা পারভীন আক্তার বলেন, রামিসা প্রতিদিনই ঘুম থেকে উঠে নানা বাহানা করতো। ওই দিনও ঘুম থেকে ওঠার পর বাসা থেকে বের হয়ে যায়। স্কুলের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে আমি ওকে ডাকাডাকি শুরু করি। কিন্তু অনেকক্ষণ চিল্লাচিল্লি করার পরও আশপাশ থেকে কোনো আওয়াজ না পাওয়ায় আমি বাসা থেকে বের হয়ে রামিসাকে খুঁজতে থাকি। এরই মধ্যে দেখি আমাদের পাশের বাসার সোহেলের ফ্ল্যাটের সামনে ওর স্যান্ডেল পড়ে রয়েছে।

আমি মনে করছি রামিসা মনে হয় ওদের বাসায়। আমি তখন বাইরে থেকে দরজায় নক করি। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ কোনো সাড়া দিচ্ছিল না। বাইরে থাকা সকলের জুতা-স্যান্ডেল দেখে আমার তখন সন্দেহ হয়। আমি আশপাশের মানুষকে ডাক দিই। অনেকেই আবার চিল্লাচিল্লি শুনে এগিয়ে আসে। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন দিই। এরপর পুলিশ এসে দরজা ভেঙে দেখে ভেতরে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না রয়েছে। ওদের জানালার গ্রিল ভাঙা। আর ওদের রুমের খাটের নিচে আমার রামিসার মাথা ছাড়া রক্তাক্ত লাশ। পরে ওদের বাথরুমের বালতির মধ্যে থেকে আমার ছোট্ট রামিসার খণ্ডিত মাথা খুঁজে পায় পুলিশ। অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি বলেন, আমি যখন ওদের দরজায় নক করছিলাম তখনই ঘরের ভেতর সোহেল ও তার স্ত্রী আমার মেয়েটাকে হত্যা করছিল। ওর ওই ছোট্ট দেহটা টুকরো টুকরো করছিল। আর সোহেল যেন পালিয়ে যায় এই জন্যই ওর স্ত্রী দরজা খুলছিল না।

মায়ের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে, তখন পাশেই বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। বার বার বিলাপ করছেন। বলছেন- আমার ছোট্ট মা’টা কই। আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো। কে আমাকে ফোন করে বলবে- বাবা তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। বাবা আমার জন্য চিপস্‌ নিয়ে এসো। আমি কার জন্য আর বাসায় ফিরবো। আমি তো আর বাঁচতে পারবো না। আমার তো কারোর সঙ্গে কোনো শত্রুতা ছিল না। কারোর তো কখনো কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে কি দোষে আমার ছোট্ট এই নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে এইভাবে হত্যা করলো? কেন করলো? এমন বীভৎস্যতা কি কেউ কারোর সঙ্গে করতে পারে? আমি কি আমার বাচ্চাকে এভাবে হত্যার বিচার পাবো?

এদিকে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ঘাতক সোহেল রানা (৩৪)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয় ঘাতক সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। সোহেল পেশায় রিকশার মেকানিক। গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে তাদের দুজনকে আদালতে হাজির করে সোহেলের বিরুদ্ধে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হয় সোহেল। বিকাল সোয়া ৩টার দিকে হাজতখানা থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে সোহেল রানাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে হাজির করা হয়।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
সোহেলের বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ওহিদুজ্জামান বলেছেন, সোহেল তার জবানবন্দিতে বলেছে, ঘটনার দিন সকালে সে প্রথমে ইয়াবা সেবন করে। এরপর দরজা খুলে রামিসা দেখতে পেয়ে তাকে ঘরের মধ্যে জোর করে ধরে নিয়ে আসে। এরপর বাথরুমে নিয়ে প্রথমে ৮ বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল। এরপর চিল্লাচিল্লি শুরু করলে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে রামিসাকে হত্যা করে সোহেল। হত্যার পর লাশের নামচিহ্ন মুছে ফেলতে কয়েক টুকরো করে লাশ বাইরে ফেলে দিতে চেয়েছিল সোহেল। এই উদ্দেশ্যেই ধারালো ছুরি দিয়ে প্রথমে রামিসার শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে।

এরপর রামিসার দুই হাত আলাদা করে কাটছিল সোহেল। এরই মধ্যে রামিসার খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পরে দরজায় নক করলে ছোট্ট রামিসার মাথাবিহীন লাশ সোহেলের শোয়ার ঘরের খাটের নিচে নিয়ে লুকিয়ে রাখে। আর মাথা তখনো বাথরুমের বালতির মধ্যে ছিল। পরে সকলে দরজা ভাঙার চেষ্টা করলে সোহেল গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। আর এই সব কাজে তাকে সাহায্য করে তার স্ত্রী স্বপ্না। তবে স্বপ্নার ভাষ্য, সে ঘরের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল। সে এসবের কিছুই জানে না। সে বলেছে- “সোহেল বিকৃত যৌনচারে আসক্ত। তার বিকৃত যৌনচারে স্বপ্না নিজেও অনেকবার অসুস্থ হয়ে গেছে। রাইসার সঙ্গেও সোহেল সেই বিকৃত যৌনচার করেছে। জবানবন্দি শেষে গতকাল বিকালে তাদের দু’জনকেই কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। তাদেরকে আদালতে হাজির করার সময় পুরো আদালত চত্বরে উত্তেজনা বিরাজ করে। সাধারণ মানুষ তাদেরকে ঘিরে ফাঁসি ফাঁসি স্লোগান দেয়। সকলেই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহত শিশুর সুরতহাল প্রস্তুত, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। তদন্তের ধারাবাহিকতায় ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে পল্লবী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

তিনি বলেন, ভিকটিম শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর ধারালো ছুরি দ্বারা মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও নৃশংসভাবে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর ধারালো ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি এবং মৃতদেহের বিচ্ছিন্ন মাথাসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় রাসিমার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

অপরদিকে গতকাল নিহত শিশু রামিসার বাসায় গিয়ে ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল আব্দুল বাতেন (অব.)। এ সময় রামিসার বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুশিক্ত হয়ে বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। তিনি বলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।

এরপর স্থানীয় এই এমপি বাইরে এসে সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই বিষয়ে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে বলেছি। একইসঙ্গে বলেছি মামলাটা যেন ঠিকভাবে করে। কারণ মামলার অনেক ফাঁক-ফোকর থাকে। আমরা দেখি অপরাধের পর আসামি গ্রেপ্তার ঠিকই হয় কিন্তু কিছুদিন পর আবার ওই ফাঁক-ফোকরে বেরিয়ে আসে। তাই মামলাটা যেন ভালোভাবে করা হয়, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি। একইসঙ্গে এই অপরাধীর সর্বোচ্চ বিচার চাই।