সাত বছরের ছোট্ট রাবু যখন হামের যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছিল, তখন পরম মমতায় তাকে আগলে রেখেছিলেন ৬১ বছরের দাদি আলেয়া বেগম। রাবুর সঙ্গে রাজধানীর শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে পালাক্রমে একদিন থাকতেন মা, আরেকদিন দাদি। কয়েক দিন যেতেই দাদি আলেয়া বেগমও সংক্রমিত হন হামে। পরে দাদি ভর্তি হন পাশের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে ফিরেছেন বাসায়। এটি শুধু আলেয়া বেগমের গল্প নয়; দেশের আরও অনেক পরিবারের বাস্তবতা। একসময় যাকে শুধুই শিশুদের রোগ ভাবা হতো, সেই হামে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশুদের পাশাপাশি পরিবারের বড়রাও।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে শুধু শিশুদের টিকাদান যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেও আনতে হবে নজরদারির আওতায়। বয়স্কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক জটিলতায় আক্রান্তরা। অথচ প্রবীণদের সুরক্ষায় দেশে সরকারিভাবে কোনো সচেতনতামূলক প্রচার বা আলাদা নির্দেশনা নেই। শৈশবের যে টিকাটি হয়তো বাদ পড়েছিল চার বা পাঁচ দশক আগে, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আজ সেই ভুলের চড়া মূল্য দিচ্ছেন প্রবীণরা। টিকা সংকটে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ায়, একদিকে যেমন এরই মধ্যে ঝরে গেছে ৪৮১টি শিশুর প্রাণ, তেমনি জীবনের শেষ বিকালে এসে হামের মরণকামড়ে হাসপাতালের আইসোলেশনে ধুঁকছেন প্রবীণরাও।
জনস্বাস্থ্যবিদ মোহাম্মদ ইকবাল জানালেন, হাম শুধু শিশুদের রোগ নয়। বড়দের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে তাদের জন্যও। বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ— যারা ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ বা অপুষ্টিতে ভুগছেন, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বয়স্ক রোগীদের জন্য আইসোলেশন সুবিধাও অত্যন্ত সীমিত।
রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম আক্রান্ত নাতি রাবু আক্তারের সঙ্গে কয়েক দিন থাকার পর নিজেও হামে সংক্রমিত হন দাদি আলেয়া বেগম। তার পুত্রবধূ শিউলি বেগম আগামীর সময়কে বললেন, ‘মেয়ের শরীরে হাম হওয়ার কয়েক দিন পরেই শাশুড়ির হাম ওঠে। উনার অনেক জ্বর ছিল, সারা গায়ে দানা দানা। শ্বাসকষ্ট ছিল, তবে কম। কিছু খেতে পারতেন না।’ শাশুড়ি ছোটবেলায় টিকা নিয়েছিলেন কি না, তা পুত্রবধূ নিশ্চিত করতে পারেননি।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আশি ও নব্বই দশকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ তুলনামূলক কম ছিল। তখন যেসব শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা যায়নি, তারা এখন প্রবীণ। তাদের অনেকের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও সময়ের সঙ্গে কমে গেছে। আবার অনেকে ভুগছেন নানান শারীরিক জটিলতায়।
ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত হয়ে জ্বর, তীব্র কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বয়স্ক রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছিলেন, বয়সজনিত কারণে তাদের নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও ফুসফুসের সংক্রমণ বেশি থাকে। তবে জটিলতা খুব বেশি মারাত্মক নয়।
রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হয় তিনটি ক্যাটাগরিতে। এর মধ্যে আট বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়স্কদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে একটা ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডে ৫১ জন বয়স্ক রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালটির মুখপাত্র আসিফ হায়দার বললেন, শুরু থেকেই হামে আক্রান্ত বয়স্ক রোগী আসছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণরাও। তবে জটিলতা তুলনামূলক কম। বয়স্কদের মধ্যে মাত্র একজন মারা গেছেন।
আসিফ হায়দার জানালেন, প্রবীণদের জন্য হাম প্রতিরোধে আলাদা নির্দেশনা বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই। হাম রোগের চিকিৎসা মোটামুটি সবারই একইরকম।
দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বয়স্ক রোগীদের জন্য আইসোলেশন সুবিধা সীমিত বলে জানালেন জনস্বাস্থ্যবিদ মোহাম্মদ ইকবাল। বললেন, ‘প্রবীণরা যদি আগে হামে আক্রান্ত না হন এবং যদি টিকা না পেয়ে থাকেন, তবে দ্রুতই টিকা দিতে হবে। এ ছাড়া পরিবারের কেউ হামে আক্রান্ত হলে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ: দেশে হামের টিকার ঘাটতি হবে জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচ-ছয়টি চিঠি দিয়েছিল ইউনিসেফ। সরকারকে অন্তত ১০টি বৈঠকে টিকা সংকটের কথা জানিয়ে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক এ সংস্থাটি। টিকা কেনার প্রক্রিয়া পরিবর্তনের কারণে দেশে সময়মতো টিকা আসেনি বলে মনে করছে ইউনিসেফ। গতকাল বুধবার ইউনিসেফের ঢাকা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বললেন সংস্থাটির প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি বলছিলেন, ‘যদিওবা আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে, অনেক শিশু মারা যাচ্ছে। তবে টিকা কাভারেজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে, হাম এখন নিয়ন্ত্রণে।’
রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, ২০২৪ সাল থেকেই তারা সরকারকে নিয়মিত (রুটিন) টিকার সংকট নিয়ে বারবার সতর্ক করে আসছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ কোটি ৭৮ লাখ (১৭.৮ মিলিয়ন) হামের টিকা আসে, যা ছিল মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) হামের টিকার প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এর ফলে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে যায়, দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়।
চলতি বছর মে মাসে দেশে আবার হামের নিয়মিত টিকা এসেছে বলে জানানো হয়। এখন দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আওতায় আনা এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।
ইউনিসেফ প্রতিনিধির ভাষ্য, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও তৈরি হতে পারে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
সাংবাদিকদের রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, সরকার চাইলে উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে টিকা কিনতে পারে। সেক্ষেত্রে টিকার মজুদ নিশ্চিত থাকা জরুরি। উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ করতে অন্তত এক বছর সময় লাগে।
হামে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু, মোট মৃত্যু ৪৮১: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৪০৮ রোগী আক্রান্ত হয়েছে। চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১ জনে। এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৯২৩ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫ হাজার ১২৮ জন।