Image description
বিআরটিএ ইকুরিয়া কার্যালয়

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বেলা ১১টা। ঢাকার কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ইকুরিয়া কার্যালয়ের গেটে  যেতেই এগিয়ে আসেন সেলিম নামে এক ব্যক্তি (দালাল)। জানতে চান, কোনো কাজ করাব কি না। মোটরসাইকেলের মালিকানা বদলির কথা বলতেই জানালেন নথিপত্র ও খরচের বিবরণ।

সেলিমের হিসাব অনুযায়ী, ১৬০ সিসি মোটরসাইকেলের মালিকানা বদলিতে ৩ হাজার ৮০০ টাকা ব্যাংক জমার পাশাপাশি স্ট্যাম্প খরচ ১৬০০ টাকা, অনলাইন খরচ ৭০০ টাকা এবং ‘টেবিল খরচ’ ৩ হাজার টাকা দিতে হবে। সঙ্গে তার বকশিশ। টেবিল খরচটা কী, জানতে চাইলে বললেন, ‘বাংলা কথায় ঘুষ’। দিলে আজকেই কাগজ পাবেন, নইলে ঘুরবেন অনেক দিন। টাকা অনেক বেশি বলে পরে আসার কথা জানালে সেলিম বললেন ‘যেকোনো কাজের জন্য আইসেন, সব কাজ করে দিতে পারব’। ঘটনাটি অন্য কারও সঙ্গে নয়, খোদ বাংলাদেশ প্রতিদিন টিমের সঙ্গেই ঘটেছে। অনিয়ম দুর্নীতি রোধে বিআরটিএর সব সেবা অনলাইন করা হলেও এখনো কমেনি দালালদের দৌরাত্ম্য। কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও দালালদের ঠেকানো যাচ্ছে না। নতুন কৌশলে সক্রিয় হচ্ছেন তারা। গ্রাহকদের তথ্য অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলিসহ বিআরটিএর সব কাজই করে দিচ্ছে দালালরা। হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। তবে বিআরটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, এখন দালাল ছাড়াই সব কাজ হচ্ছে। অনেক গ্রাহক অসচেতনতার কারণে দালালের কাছে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন।

১৪ মে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিআরটিএর ইকুরিয়া কার্যালয়ে সরেজমিন ঘুরে বিআরটিএর কর্মী বা গ্রাহক নয়, অন্তত এমন ১০ থেকে ১৫ জনকে দেখা গেছে কাগজপত্র নিয়ে ছোটাছুটি করতে। একজনের কাছে পরিচয় জানতে চাইলে, দ্রুত সরে পরেন তিনি। বাংলাদেশ প্রতিদিন টিমকে কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া সেই সেলিমকেও দেখা গেছে কাগজপত্র হাতে বিআরটিএর এই কার্যালয়ে। এক ব্যক্তিকে একটি কাজ দিয়ে টাকা নিতে দেখা গেছে দায়িত্বরত আনসার সদস্যকেও। দালাল ছাড়া নিজের কাজ নিজে করতে এসে ভোগান্তিতে পড়ার কথাও জানিয়েছেন একজন গ্রাহক।

সরেজমিন বিআরটিএ কার্যালয়ের ঠিক গেটেই এক স্ট্যাম্প ভেন্ডরকে অবৈধভাবে দোকান সাজিয়ে বসতেও দেখা গেছে। কার্যালয়ের ঠিক উল্টা পাশে থাকা কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানগুলোতেও গ্রাহকদের ভিড় দেখতে পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন টিম। তবে সিন্ডিকেট করে ৫-১০ মিনিটের কাজের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে দোকানগুলোর বিরুদ্ধে। এসব দোকান ও দালালের সঙ্গে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে গ্রাহকের কাছ থেকে। এদিন বিআরটিএর এই কার্যালয়ে প্রবেশ করেই বেশ কিছু যানবাহনকে লাইন দিয়ে থাকতে দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু এসেছে ফিটনেস সনদ গ্রহণে এবং কিছু মালিকানা বদলিতে। এই সময়ে নতুন নিবন্ধনের জন্য আসা দুটি মোটরসাইকেল ও একটি বাস দেখা গেছে। বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২ এর পাশাপাশি ঢাকা জেলা সার্কেলের কার্যক্রম চলে এখানে।

ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৩ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত নয় কার্যদিবসে বিভিন্ন ধরনের ৩৬৭টি যানবাহন নিবন্ধন হয়েছে এই কার্যালয়ে। একই সময়ে ১ হাজার ২৬৫ যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়েছে এখান থেকে। এ ছাড়া এই কার্যালয় থেকে ২১৯টি যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে, যার মধ্যে ১১৫টিই মোটরসাইকেল। আর এই সময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে দুটি বোর্ডে ১ হাজার ৫০ জন আবেদনকারী পরীক্ষা দিয়ে ৬৯৪ জন পাস করেছেন।

টেবিল খরচ ১০০০-৩০০০ টাকা : দালালদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএর এ কার্যালয়ে এই খরচ শুধু মালিকানা বদলিতে নয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সনদ ও গাড়ির নিবন্ধনসহ সব ধরনের কাজের জন্যই টেবিল খরচ নির্ধারিত রয়েছে। একজন দালালের দাবি, প্রতিটি ফাইলের জন্য কাজ ভেদে এক থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। কাগজপত্রে কোনো সমস্যা থাকলে সেই রেট আরও বাড়ে। এই টেবিল খরচ বিআরটিএর ভিতরে ওপেন সিক্রেট বলেই দাবি ওই দালালের। তিনি বলেন, কখনো কখনো টাকা হাতে হাতেও নেন বিআরটিএ সংশ্লিষ্টরা। আবার কখনো কখনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও পরিশোধ করা হয় টাকা।

ভোগান্তির অভিযোগ গ্রাহকের : নিজের কাজ নিজে করতে এসে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন একটি নতুন মোটরসাইকেলে নিবন্ধন করতে আসা আরাফাত। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে অভিযোগ করে বলেন, দালালের সাহায্য ছাড়া কোনো নাগরিক নিজে ফাইল জমা দিতে গেলে পদে পদে ভুল ধরা হয়। সব বৈধ কাগজপত্র এবং ব্যাংকের জমার রসিদ থাকার পরও ফাইলে খুঁটিনাটি ও কাল্পনিক ভুল ধরে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয় কারেকশনের জন্য। কারেকশন করতে কম্পিউটারের দোকানে গেলে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ঝামেলাহীন কাজ করে দেওয়ার কথা বলেন দোকানদার। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত চার দিন বিআরটিএতে এসেছি, আমি কোনো অতিরিক্ত টাকা দেব না বলে ঠিক করেছি। যতই ভোগান্তি হোক, যত বারই কারেকশন দিক, আমি সব করে নিজের কাজ নিজে করব।

যা বললেন বিআরটিএ কর্মকর্তা : দালালদের দৌরাত্ম্য ও গ্রাহক ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ ইকুরিয়া (ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২) কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দালালদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি মাসে দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ছয়জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।

দালালদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার সঙ্গেই দালালদের যোগাযোগ নেই। অধিকাংশ সময়ই গ্রাহক অসচেতনতার কারণে দালালদের কাছে যায়। তিনি বলেন, এখন বিআরটিএর সব ধরনের কাজই অনলাইনে হয়। অনেক সময় কার্যালয়ে আসতেও হয় না। ঘরে বসেই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তবে অনেক সময় গ্রাহকরা না জানার কারণে দালালদের দ্বারস্থ হয়ে প্রতারিত হন তারা। দেখা যায়, ওই দালাল কাউকেই টাকা দেয়নি, অথচ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে নেয়। তাই দালাল বা প্রতারক শ্রেণির লোকদের রুখতে গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে বলে মনে করেন বিআরটিএর এই কর্মকর্তা।