Image description

দফায় দফায় ঢাকার সড়কে নতুন বাস নামানোর রুট পারমিট দেয়া হয়েছে। তবুও নতুন বাস নামাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না মালিকরা। ফিটনেসবিহীন বাসে ঠাসা রাজধানীর সড়কগুলো। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে লক্ষাধিকেরও বেশি লক্কড়ঝক্কর বাস চলাচলের কারণে পরিবহন সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, ফিটনেস সিন্ডিকেট ইত্যাদি মিলিয়ে ঢাকায় গণপরিবহনের পরিস্থিতি নাজুক। সংশ্লিষ্টদের দাবি- নতুন বাস নামানো অলাভজনক।

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ। যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহনের পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও রুট নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কাজ করে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি। সূত্র জানিয়েছে, একাধিক দফায় ঢাকায় বিভিন্ন রুটে বাস নামানোর জন্য রুট পারমিট দেয়া হয়েছে গত এক বছরে। রুট পারমিট নিলেও নতুন বাস নামান না পরিবহন মালিকরা। রুট পারমিট দেয়ার পর ৬ মাস সময় বেঁধে দেয়া হয় রুট পারমিট গ্রহণ করার।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস নামানোর আগ্রহ দেখান না মালিকরা। গত বছর ২৩শে এপ্রিল ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির একটি মিটিং হয়। সেখানে বেশ ক’টি বাসের নতুন রুট পারমিট দেয়া হলেও একই বছর নভেম্বরে হওয়া দ্বিতীয় বৈঠকের আগে বেশির ভাগ রুটেই নামেনি নতুন বাস। গত ৬ই নভেম্বর ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির আরেকটি মিটিং হয়। সেখানেও কয়েকশ’ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের রুট পারমিট দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত একটি বাসও সড়কে নামেনি।

গত দু’টি সভার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ২৩শে এপ্রিলের সভায় ১৯টি বাস কোম্পানিকে ২ হাজারেরও বেশি নন-এসি বাস নামানোর জন্য রুট পারমিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ঢাকা চাকা লিমিটেড আলাদা আলাদা ২৩৫টি নন-এসি, ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ ২০০টি নন-এসি, আজমেরী পরিবহন ২০০টি নন-এসি, বিকাশ সেবা ট্রান্সপোর্ট ১৫০টি নন-এসি বাসের রুট পারমিট নেয়।

অন্যদিকে ৬ই নভেম্বর হওয়া সভায় কমিটি ৬৯০টি এসি বাসের রুট পারমিটের আবেদন মঞ্জুর করে। এর মধ্যে ২০০টি এসি বাস চালানোর অনুমতি পেয়েছে শাপলা পরিবহন, যেগুলো চন্দ্রা থেকে ধোলাইখাল রুটে চলাচল করবে। এ ছাড়া চিত্রা পরিবহন লিমিটেড ১২০টি, টাইম বার্ড এক্সপ্রেস ১০০টি এবং স্প্রিন্ট শ্যাটল প্রাইভেট লিমিটেড দু’টি ভিন্ন রুটে মোট ১০০টি বাস নামানোর অনুমোদন পেয়েছে। অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে ইকবাল এন্টারপ্রাইজ ও নিউ ঢাকা পরিবহন ৫০টি করে এবং ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস ৪০টি ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট লাইন ৩০টি এসি বাসের পারমিট পেয়েছে।

ওদিকে বিআরটিএ’র নিয়ম অনুযায়ী, বাস ও মিনিবাসের ইকোনোমিক লাইফ বা আয়ষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাক ও কার্ভাডভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর। বাংলাদেশ বিআরটিএ’র হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৩৯ হাজার ১৬৯টি বাস ও মিনিবাস এবং ৪১ হাজার ১৪০টি ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্যাংকারের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ২৫ বছর নির্ধারণ করে এবং একটি খসড়া স্ক্র্যাপিং নির্দেশিকা প্রস্তুত করেছিল। সেই উদ্যোগও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সড়ক পুরনো আর লক্কড়ঝক্কর যানবাহনের দখলেই থেকে যায়। বিআরটিএ বারবার সড়ক থেকে এসব যানবাহন উচ্ছেদের কথা জানালেও আদতে কোনো কাজেই আসেনি সেসব উদ্যোগ।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন কারণেই বাস মালিকরা ঢাকায় নতুন বাস নামাতে আগ্রহ দেখান না। বড় কারণ নতুন বাস নামানো অনেকটাই অলাভজনক। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি মহাসচিব সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ঢাকায় নতুন বাস নামাতে চায় না, কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাস নামানো অলাভজনক। ভাড়া কম, যানজট পণ্যের দাম বাড়লেও ভাড়া না বাড়া ইত্যাদি মিলিয়ে নন-এসি বাসে লোকসান বেশি হয়। অনেক সময় গাড়ির পার্টসপাতি, চেসিস ইত্যাদির দাম বাড়লেও ভাড়া বাড়ানো যায় না।

এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই শহরতলীর বাসগুলো অলাভজনকই হয়। বাস মালিকরা তাদের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে রুট পারমিট চায়। পরে আলোচনার মাধ্যমে সরকার রুট পারমিট দেয়। গত আলোচনা সভায় কোনো নন-এসি বাসের পারমিট দেয়া হয়নি। আবার এর আগের সভায় কোনো এসি বাসের রুট পারমিট দেয়া হয়নি। এবার মানুষের চাহিদা ও লাভের কথা বিবেচনা করে শুধুমাত্র এসি বাসের রুট পারমিট নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৩টা কোম্পানি এসি বাস তৈরি করছে বলে জানিয়েছে। তারা হয়তো আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে বাসগুলো সড়কে নামাতে পারবে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিআরটিএ’র আরটিসি (আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি) রুট পারমিট দেয়। তারাই হলো সমস্যার মূল কারণ। ব্যানার বিক্রির নামে তারা উইদাউট এনি ইনভেস্টমেন্ট এখান থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এই দেশে বাস ব্যবসা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। লাভ অনেক কম। সুতরাং সরাসরি ব্যবসা না করে এই বিআরটিএ’র আরটিসি কমিটির অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যদি বিজনেস করা যায়; যুগের পর যুগ সেটাই করছে। সে কারণেই আজকে আমাদের এই বাসের বিশৃঙ্খলা দেখি, লক্কড়ঝক্কর দেখি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখি।