দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গতকাল দু’পক্ষের সংঘর্ষ ও হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গাজীপুরস্থ ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)। এতে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। নতুন ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) যোগদানে সন্তুষ্ট নন তারা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ডুয়েট থেকেই ভিসি চান। এদিকে আন্দোলনে উত্তাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও। এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের দাবিতে চলছে এই আন্দোলন। ভিসি-বিরোধী আন্দোলনে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে অস্থিরতা।
গাজীপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, ডুয়েটে নতুন ভিসি’র যোগদানকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছিল ক্যাম্পাসে। সকাল থেকে বিক্ষোভ, পাল্টাপাল্টি অবস্থান, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস এলাকা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন।
এদিন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইকবাল ডুয়েটে যোগদান করতে এলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তিনি দিনভর ডুয়েটের সামনের গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবস্থান করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সকাল থেকেই নতুন ভিসিকে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট বন্ধ করে লাল কার্ড কর্মসূচি পালন করেন এবং ‘বহিরাগত ভিসি মানি না, ‘ডুয়েটে ডুয়েটিয়ান ভিসি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনকারীরা নতুন ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, নতুন ভিসি’র সমর্থনে ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান নেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ সরকার সমর্থক একটি পক্ষ। তাদের সঙ্গে ডুয়েটের বাইরের ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরাও যোগ দেন। একপর্যায়ে নবনিযুক্ত ভিসিকে নিয়ে সমর্থকরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষ চলাকালে উভয়পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে কয়েকটি ককটেলও নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ডুয়েট একটি বিশেষায়িত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার প্রশাসনিক ও একাডেমিক বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো বোঝেন ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষকরা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য শিক্ষকদের মধ্য থেকেই ভিসি নিয়োগ দেয়া উচিত।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষের সময় ইটপাটকেলের আঘাতে তিনিসহ পুলিশের অন্তত পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে এবং বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রতিনিধি জানান, সাম্প্রতিক ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করছেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
গতকাল ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্তের দ্রুত বিচার ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবিতে নতুন প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার দিকে তারা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটক ও ভেতরের একটি ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের ৬ দফা দাবির অন্যতম ছিল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা। তা সম্ভব না হলে পুরো প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ দাবি করেন তারা। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা মুন বলেন, প্রশাসন আমাদের জানাক আর কতো সময় লাগবে অভিযুক্তকে ধরতে। সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আমরা অবস্থান চালিয়ে যাবো।
ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী আদৃতা রায় অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন আন্দোলনকারীদের কাছে তদন্ত বা গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার কোনো স্পষ্ট অগ্রগতির তথ্য দিতে পারেনি। তিনি বলেন, ১০৬ ঘণ্টা পার হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। শুধু বলা হচ্ছে কাজ চলছে।
এদিকে শনিবার ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দেয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর ও সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক এক যৌথ বিবৃতিতে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবির প্রতি সংহতি জানান এবং সেইসঙ্গে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ভিসি’র সঙ্গে একদল শিক্ষার্থীর অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করাকে তারা অনভিপ্রেত, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন।
আরেক বিবৃতিতে দর্শন বিভাগ অ্যালামনাই এসোসিয়েশনও নিন্দা জানায়। এসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার ও সাধারণ সম্পাদক মতলুবর রহমান রাসেল স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গা হিসেবে পরিচিত। তাই তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে।
এদিকে ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি প্রশাসনিক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এদিকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে স্থবিরতা। সেখানে বন্ধ রয়েছে সকল ধরনের কার্যক্রম। কর্মবিরতির পঞ্চম দিনের অবস্থান কর্মসূচি ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ পালন করেছে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় ভিসি প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তাকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেয়ার ঘোষণা দেন। রোববার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তালা ঝুলছে ভিসি, রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরে।
মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভিসি ও প্রো-ভিসি দ্বন্দ্বের জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ। এ ছাড়াও গত সোমবার সকালে ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় দুমকী উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম কিবরিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতির দাবিতে গত এপ্রিল থেকে টানা আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষকরা প্রথমে ক্লাস এবং পরে পরীক্ষাও বন্ধ করে দেন। বিভাগীয় কমিশনার, ভিসি ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর সাময়িক সমাধানের আশা তৈরি হলেও বিশেষ সিন্ডিকেট সভাতেও সংকট কাটেনি। ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পূর্ণাঙ্গ শাটডাউন পালন করা হয় এবং প্রশাসনিক দপ্তরে তালা ঝোলানো হয়। এ সময় বহু শিক্ষক প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তালা খোলা হয়। নতুন ভিসি হিসেবে অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ নিয়োগ পাওয়ার পর শিক্ষক সমাজ আন্দোলন প্রত্যাহার করে।