বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের আলোচিত ব্যক্তিত্ব কবি, ভাবুক ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। স্বকীয় চিন্তা, কল্যাণী দর্শন ও অভূতপূর্ব লেখনীর মাধ্যমে তিনি খুঁজেছেন গণমানুষের মুক্তি। ফ্যাসিবাদ রেজিমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনড় অবস্থান তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। রাষ্ট্রচিন্তা, তত্ত্ব, ধর্ম ও রাজনীতি ছাপিয়ে ফরহাদ মজহারের চিন্তা অতিক্রম করেছে চিরাচরিত সীমানা। তার দার্শনিকতা তুমুল প্রশংসতি, আলোচিত ও সমালোচিত। এশিয়া পোস্টের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেছেন নিজের চিন্তা, দেশের সংবিধান, গণ-অভ্যুত্থান ও সমসাময়িক প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম।
এশিয়া পোস্ট: ‘আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছো ইতিহাসের সামনে, আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছো পরিবর্তনের সামনে, এখন আমার আর ফেরার উপায় নেই।’ আপনার কবিতার পঙ্ক্তির মতো আসলে লড়াইয়ের যাত্রায় পরিবর্তন হলো কতটুকু?
ফরহাদ মজহার: পরিবর্তন তো হয়েছে, নিঃসন্দেহে পরিবর্তন হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে। একটা হচ্ছে ইতিবাচক দিক, আরেকটা হচ্ছে তার প্রত্যাশার দিক, সম্ভাবনার দিক। এর মধ্যে যে সম্ভাবনা ছিল তা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি এবং সেটা কেন পারিনি ভাবা দরকার। এখন খুব খোলা মনে আলোচনা করতে হবে যে, আসলে কী সম্ভাবনা ছিল। আমাদের তরুণরা মনে রাখুন, আন্দোলনটা ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে।
মানে ওরা আমলা হতে চেয়েছিল। মানে সমাজ বাস্তবতা এমন একটা জায়গায় ছিল, যখন তরুণরা স্বপ্ন দেখতো আমলা হওয়ার। কারণ, আমলা না হলে তারা বিয়ে করতে পারে না। কেউ মেয়ে বিয়ে দেয় না। সেখান থেকে তরুণদের একটা রেডিক্যাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা ভূমিকা রাখতে পারে ইতিহাসে। এটা বিরাট ঘটনা এবং এর যে ইম্প্যাক্টটা পরবর্তী তরুণদের মধ্যে পড়বে, পরবর্তী জেনারেশনের মধ্যে পড়বে এটা ইতিবাচক হবে নিঃসন্দেহে। জুলাইয়ে যে ঘটনা ঘটেছে এটার ঐতিহাসিক তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত।
দ্বিতীয়ত, সংবিধান নিয়ে কোনো আলোচনাই ছিল না আমাদের সমাজে। কার্যত আমরা অনেকে কিছু আলোচনা করেছি। কিন্তু কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার, গণতন্ত্র এই মৌলিক প্রশ্ন ও তর্কগুলো আমাদের সমাজে একদমই অনুপস্থিত ছিল। গণ-অভ্যুত্থান এখন এই তর্কগুলোকে নিয়ে এসেছে।
এই তর্কগুলো সমাজে জারি আছে বলেই বিএনপির প্রতি জনগণের যে দৃষ্টিভঙ্গি এখন ইতিবাচক না। ভোট দিয়েছে ঠিকই। কারণ, বিএনপি ছাড়া আর কারা ছিল?
জামাতে ইসলামী বা এনসিপি। কিন্তু সেদিক থেকে আওয়ামী লীগ তো নেই। তো সে জায়গায় বিএনপি এক হিসেবে আওয়ামী লীগই। এটা আওয়ামী লীগ-বিএনপির সরকার বলতে পারেন। সমাজের সাধারণ যে পরিবর্তন, গুণগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে তারা বাধা দিয়ে সফল হয়েছে। সমাজের মৌলিক যে আকাঙ্ক্ষা, জনগণের যে প্রত্যাশা এবং বিশ্বে আজকে যে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, আজকে যে জ্বালানি নিয়ে সংকটগুলো তৈরি হয়েছে; এ সমস্ত কিছু মিলিয়ে আমরা তো নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারি, আগে তো পারতাম না। বাংলাদেশকে যে নতুন করে গঠন করা দরকার এবং আমরা যে একটা শক্তিশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে দাঁড়াতে পারি, এই স্বপ্নগুলো এসে গেছে সমাজে।
সবকিছু মিলিয়ে আমি ইতিবাচক আকারে দেখি নিঃসন্দেহে, আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি কোনো সমস্যা নেই। সেটা আলোচনা হতেই পারে।
এশিয়া পোস্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তাত্ত্বিক অভিভাবক মনে করা হয় আপনাকে। আপনার রচিত গ্রন্থ ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ প্রকাশ হয় ৫ আগস্ট ২০২৩, ঠিক এক বছরের ব্যবধানে, একই দিনে অভ্যুত্থান সংঘঠিত হওয়াটা কি কাকতালীয় কোনো ঘটনা?
ফরহাদ মজহার: না, আমি এটা কাকতালীয় মনে করি না। অনেকে হয়তো মনে করেন। আমি তো নিজের সম্পর্কে কিছু বলব না। এটা আমাদের সমাজের যারা বোঝেন, তারা এটা বলবেন। একটা ব্যাপার ছিল যে বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রের একটা গঠনতান্ত্রিক রূপান্তর দরকার, এটা কিন্তু আমরা ওই এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বলেছি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় কী ছিল? ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা বলে আমরা কী করলাম, একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারি ব্যবস্থা কায়েম করলাম।
আমরা যদি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতাম এবং নির্বাচনের সময়কালে সকল নির্বাহী ক্ষমতা যদি এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকত, আমাদের কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার করার প্রয়োজন ছিল না। ফলে ওই সময় থেকে আমার যে পুরোনো বই ‘সংবিধান ও গণতন্ত্র’ সেখানে যে বিষয়গুলো আমি তুলে এনেছি, ওটাই কিন্তু আমি ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠনে’ আমি লিখেছি।
গণ-অভ্যুত্থান কথাটা আমি কেনো বলতে পেরেছি? ২০২০ সালের শুরু থেকে আমি বুঝে গেছি, বাংলাদেশ একটা বড় ধরনের রূপান্তরের জন্য তৈরি হয়ে গেছে। সেই হিসেবে বলব ২০২০ সাল থেকে ২০২৩ কিন্তু খুব অল্প সময়, মানে গণ-অভ্যুত্থান যদি হয়ে যায়, তার পরে নতুন রাষ্ট্রটা কীভাবে গঠন করতে হবে এটার কিন্তু পরিষ্কার রোডম্যাপ বা নকশা আমার বইয়ে ছিল। কিন্তু তরুণ সমাজ সেটাকে বাস্তবায়িত করতে পারেনি। তো সেই হিসেবে গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে আমার যে বক্তব্য ছিল, এটা তো আমি করে দেখিয়েছি। অথাৎ দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে।
বাংলাদেশের রূপান্তরটা গণ-অভ্যুত্থানের পথে হবে। আজকেও আমি বলতে চাই যে বিএনপি একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, যদি তারা আন্তরিকভাবে আমাদের সমালোচনাগুলোর দিকে মনোযোগ দেয়। সংকটের গোড়াগুলো তারা যদি অ্যাড্রেস করে, বিশেষ করে গঠনতন্ত্রের বিষয়ে।
এই বিতর্কগুলো ইতিবাচকভাবে সব পক্ষ যদি মিমাংসা করে এবং অন্তত একটা ইতিবাচক অভিমুখের দিকে আমরা যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে কিন্তু বিএনপি টিকে থাকতে পারবে। আর যদি বিএনপি টিকে থাকতে চায় এবং এটাকে সে যদি অবহেলা করে, আমি মনে করি যে আমরা মহাবিপর্যয়ের দিকে যাব এবং বিএনপিকে তখন আরও বড় গণ-অভ্যুত্থান মোকাবিলা করতে হবে। কারণ, সমাজের মধ্যে ওই দ্বন্দ্বগুলো, ওই বিরোধগুলো থেকে গেছে। আমি মনে করি বাংলাদেশ এটা গুণগত রূপান্তরের দিকে যাবেই।
এশিয়া পোস্ট: যে আকাঙ্ক্ষায় ১৪০০ জীবনের বিনিময়ে ছাত্র-জনতা জুলাই অভ্যুত্থান সংঘঠিত করেছে, তা সফল হয়েছে কি না? না হয়ে থাকলে এর দায় কার?
ফরহাদ মজহার: আমি প্রথমেই উত্তর দিয়েছি সফল হয়েছে। শেখ হাসিনা আছে নাকি বাংলাদেশে? নেই তো। নাম্বার ওয়ান। ফলে আপনি অসফল কেন বলছেন? দুই নাম্বারটা হচ্ছে এই যে তরুণরা আমলা হওয়ার জন্য তাদের জীবনটাকে ঠিক করেছিল ক্যারিয়ার আকারে। এই তরুণদের বিশাল একটা অংশ মনে করে যে, রাজনীতিতে ভূমিকা রাখা যায়, নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠন করা যায়। আপনি তরুণদেরকে সংসদে দেখছেন ভালো হোক মন্দ হোক, তাদের সমালোচনা কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ওরা তো সংসদে গেছে। তা এতো বিশাল ঘটনা। আপনি এটাকে ছোট করছেন কেন?
এশিয়া পোস্ট: আপনার একটা লেখায় বলেছেন, দেশে হাসিনাবিহীন একটি হাসিনাব্যবস্থা কায়েম আছে। কীভাবে?
ফরহাদ মজহার: আমরা হাসিনাবিহীন হাসিনাব্যবস্থার মধ্যে আছি। সেই ব্যবস্থাকে আমরা ভাঙতে পারিনি। এটার একটা বড় কারণ হচ্ছে আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশটা ঘটেনি। রাষ্ট্র এবং সরকার তো এক না। রাষ্ট্র গঠন করার কর্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কাজ। ফলে রাষ্ট্র গঠন আলাদা কাজ, এটা কিন্তু আমাদের সমাজে অস্পষ্ট। রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি রেখে আপনি যদি শুধুমাত্র সেখানে কিছু ব্যক্তিকে বসিয়ে দেন, তাহলে আপনি কোনো ইতিবাচক ফল পাবেন না। তাহলে জনগণের জন্য তো এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা, দ্বিতীয়বার তারা এ ভুল করবে না। তারা পুরোনো সংবিধান পুরোনো কথাবার্তা কিন্তু শুনবে না।
দ্বিতীয়ত, জনগণ তো শোনাতেও পারবেন না। কারণ, আজকে জ্বালানি সংকটের কারণে যে বিপর্যয়ের মধ্যে জনগণ প্রবেশ করতে যাচ্ছে, এটা তো ভয়াবহ বিপর্যয়। আপনি কী করে এটাকে সমাধান করবেন? কারণ এটা করতে গেলেই আপনি যদি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার পুনর্গঠন করতে চান, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আবার নতুন করে আপনি সাজাতে চান, যা কিছু করতে চান, আপনাকে নতুন রাষ্ট্রের চিন্তা করতেই হবে। ফলে আমরা তো পিছিয়ে পড়িনি। আমরা তো অগ্রসর হয়েছি।
এশিয়া পোস্ট: অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশ বারবার গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফল হওয়ার পর আবার সেই পুরোনো ধারাতেই ফিরে যায়। এর কারণ কী?
ফরহাদ মজহার: প্রথমত হচ্ছে, যারা এটা ভাবেন তাদের প্রশ্ন যে ছকে তারা হাজির করছেন এটা ভুল ছক। আমাদের সমাজে গণতন্ত্র সম্পর্কে ধারণাটি ভুল। নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তো গণতন্ত্র কায়েম করতে পারি না। গণতন্ত্র হচ্ছে রাষ্ট্রের একটা ধরন, নির্বাচন হচ্ছে একটা প্রক্রিয়া। রাষ্ট্র যদি অগণতান্ত্রিক হয়, যদি আমরা হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থার মধ্যেই বাস করি। আমরা তো গণতন্ত্র কায়েম করতে পারিনি। এই সরকার গণতান্ত্রিক নয়। নিবার্চন করলেই গণতন্ত্র হয় না। যে সংবিধানের আলোকে নিবার্চন হয়েছে, তা সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। বিচার বিভাগ স্বাধীন না, প্রধানমন্ত্রী সবর্ময় ক্ষমতার অধিকারী।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে ড. ইউনূস এসে আবার শেখ হাসিনার সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে আমাদেরকে পিছিয়ে দিয়েছেন। এটা তো আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। কিন্তু আমরা তো বুঝে গেছি এখন যে গণতন্ত্র বলতে এই কাগজ বুঝায় না। সংবিধান-নামক কোনো কাগজ বুঝায় না। কারণ, অন্তবর্তী সরকার ও উপদেষ্টা ছিল অবৈধ। ফলে উপদেষ্টা সরকারের দ্বারা যে নির্বাচন হয়েছে, তা-ও ছিল অবৈধ। ফলে বর্তমান সরকারও আইনের দিক থেকে অবৈধ সরকার।
নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র কায়েম হয়েছে? না। এই সরকারটা আসছে তার কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি নেই, তার কোনো লিগ্যাল আইনি কোনো ভিত্তি নেই। এটা যে কোনো মুহূর্তে খসে পড়তে পারে।
আপনি কীসের ভিত্তিতে এই নির্বাচনটা করলেন? আপনি হাসিনার সংবিধান যদি মানেন, তাহলে তো নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৯ সালে। তাহলে সংবিধানের কোথায় আছে যে এখন নির্বাচন হতে হবে? তাহলে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে পদে পদে আপনি সংবিধানের লঙ্ঘন করে সরকার গঠন করে আপনি ক্ষমতায় রয়েছেন। আপনাকে সেনাবাহিনী সমর্থন করে। উপদেষ্টা সরকারকেও সেনাবাহিনী সমর্থন করেছে। ফলে এর পেছনে রয়েছে একটা বল প্রয়োগের ক্ষমতা। এটার কোনো রাজনৈতিক বৈধতা নেই, এটার কোনো আইনি বৈধতা নেই।
এই তর্কগুলো আমাদের সমাজে আছে। আপনি তো গায়ের জোরে বলতে পারেন যে, আমি যেহেতু নির্বাচনে ভোট পেয়েছি, আমি বৈধ, না। নির্বাচন বৈধতা দেয় না আপনাকে। কারণ, জনগণের অভিপ্রায় বলে একটা ব্যাপার আছে। সেই অভিপ্রায়টা আমরা দেখেছি পাঁচ আগস্ট।
১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল, ওটা তো জনগণ প্রণয়ন করেনি। তার মানে রাষ্ট্র তো প্রথম থেকেই গঠিত হয়নি। করেছে পাকিস্তানিরা। ফলে আপনি পাকিস্তানিদের নির্বাচিত করেছেন, পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য।
সংবিধান প্রণয়ন করার ক্ষমতা জনগণের, আপনি আগে ছিলেন পাকিস্তান। পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য আপনাকে লোকে ভোট দিয়েছে? আপনার তো বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য আমরা ভোট দিইনি। আপনি তো এমন কোনো গণপরিষদ সেই সময় গঠন করেননি। স্বাধীন বাংলাদেশে যেখানে আপনি নতুন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে এসে সংবিধান প্রণয়ন করবেন। তাহলে ৭২ এর সংবিধান ছিল পাকিস্তানের সংবিধান।
এশিয়া পোস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ডিপস্টেটের ক্ষমতা’ বলে একটা কথা চাউর আছে। জনরায় যেমন থাকুক, প্রভাবশালী সেই শক্তির মর্জি মতো ক্ষমতার পালাবদল ঘটে থাকে বলে ধারণা প্রচলিত আছে। এই কথার ভিত্তি কতটুকু?
ফরহাদ মজহার: যারা ডিপস্টেটের কনসেপ্ট বলেন, তারা স্টুপিড। খুব সিম্পল। ডিপস্টেট বলে কিছু নেই। পাঁচ আগস্ট আপনার কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে সংবিধানের নামে, এটা তো ডিপস্টেটের ব্যাপার না। আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে কারা এটা করে। আপনি তো তখন তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছেন। ওরা তো পরিচিত লোক। আমাদের ছাত্ররাও আছে। যারা এই গণ-অভ্যুত্থান করেছে, তারা তো এরমধ্যে আছে। ফলে ডিপস্টেট বলে তারা যেটা এখন বলছে, এটার মানে হচ্ছে এটা একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এটা আসে কোথা থেকে, যেহেতু আপনি রাজনীতি ব্যাখ্যা করতে অক্ষম এবং আপনি এমন কিছু অপরাধ করেছেন, এটাকে আপনি লুকাতে চান। এই শব্দটা আমি দেখেছি নাহিদ ব্যবহার করছে সংসদে গিয়ে।
আমি নাহিদকে প্রশ্ন করব। তুমি যখন শেখ হাসিনার সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছিলে, তখন তোমার ডিপস্টেটের কথা খেয়াল ছিল না? তো ডিপস্টেট তো তুমি নিজে। তুমি জানো না যে এই সংবিধানের শপথ যখন তুমি নিচ্ছিলে, তখন তুমি গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে বেইমানি করেছো। তোমার তো জানা উচিত।
আমি খেয়াল করেছি যে, এনসিপি দ্বিতীয় রিপাবলিকের কথা বলা শুরু করছে। তো কেন এনসিপি দ্বিতীয় রিপাবলিক কথা শুরু করবে? রিপাবলিক আর গণতন্ত্র তো এক না। ডিপস্টেটের তর্কটা একটা ভুয়া তর্ক। আমাদের এখানে আমরা গণতন্ত্র কায়েম করতে পারিনি। এর রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। কায়েম করতে না পারার জন্য আমাদের সেনাবাহিনী, বিএনপি ও এই রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আছে।
তো ডিপস্টেট তো এই তিনটা। এটা তো খুব পরিষ্কার চোখের সামনে। সেনাবাহিনী, চুপ্পু এবং বিএনপিই তো ডিপস্টেট । বহির্শক্তি ডিপস্টেট না। বহির্শক্তি তো রেজিম চেঞ্জ করে এ দেরকে দিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজকে রেজিম চেঞ্জ করে কার দ্বারা, ওই তো বললাম যে সেনাবাহিনীর দ্বারা, আমাদের যে প্রেসিডেন্ট আছেন তার দ্বারা এবং তিন নাম্বার বিএনপির দ্বারা।
তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে এখন ইতিহাসের কাছে। ছাত্ররা যতটুকু বিপ্লব করতে পেরেছে, আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি যে এর বেশি তাদের কাছে আশা করি না কেন? যেহেতু চিন্তার দিক থেকে তারা অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিন শক্তি দায়ী। সেনাবাহিনী, চুপ্পু এবং বিএনপি। কালের কণ্ঠে চুপ্পুর সাক্ষাৎকার পড়ে দেখুন। ড. ইউনূসের নাম তো বলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, তিনি তো তাদের যে নকশা, এই নকশা ড. ইউনূস বাস্তবায়িত করেছে। তাহলে এখানে ডিপস্টেট কোথায়?
এশিয়া পোস্ট: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এখন যে ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী? তারা কি কাঙ্ক্ষিত নতুন সমাজ গঠনে প্রস্তুত?
ফরহাদ মজহার: প্রথমত, রাষ্ট্রীয় ধারণাটা তাদের কাছে এখনও অস্পষ্ট। আমি বারবার একটা কথা বলেছি, তাদের মধ্যে পড়াশোনা এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার চেষ্টা কম, প্রয়াস কম। এটা আমার কাছে দুঃখজনক মনে হয়। আমি মনে করি, তারা যে সকল তর্ক এবং প্রশ্নগুলো তুলছেন এই তর্ক এবং এই প্রশ্নগুলো সঠিকভাবে তার তুলতে পারছেন না।
এশিয়া পোস্ট: কোনো গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লবকে পূর্ণতা দিতে রাজপথের লড়াই নাকি চিন্তা ও দর্শনের লড়াই—নাকি দুটোই কী গুরুত্বপূর্ণ?
ফরহাদ মজহার: সমাজের চিন্তার মৌলিক রূপান্তর না ঘটলে রাষ্ট্রের চরিত্রে তার কোনো প্রতিফলন ঘটে না। ফলে আমাদের সমাজের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তা-তর্ক, চিন্তার শক্তি এবং ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে। চিন্তাকে বাস্তবায়ন করার যে পদ্ধতি এবং অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশে আছে সেখান থেকে শেখার বিষয় আছে। আমরা যারা নিজেদেরকে মার্কসের অনুসারী বলে মনে করি, আমরা কখনো তত্ত্ব এবং মাঠের লড়াইকে আলাদা করি না। কারণ তত্ত্ব ছাড়া যেমন রাজনীতি নেই, তেমনি আবার মাঠের কাজ ছাড়া তো তত্ত্ব দ্বারা কাজ হবে না। কিন্তু মার্কস মজার কথা বলেছেন।
মার্কস বলেছিলেন যে, তত্ত্ব যেমন জনগণের জন্য লেখা হয়, আবার জনগণকেও তত্ত্বের দিকে আসতে হয়।
কিন্তু চিন্তার বিকাশ প্রয়োজন। আমরা এখন যে কথাটা বলছি, এটা কিন্তু চিন্তার বিকাশের ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। ফলে জনগণকে নতুন করে চিন্তা করবার তার যে শক্তি তার যে হিম্মত, এটা তৈরি না করলে কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তর ইমপসিবল। চিন্তার ক্ষেত্রে আগে আপনার স্বচ্ছ হতে হবে।
এশিয়া পোস্ট: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ‘আগ্রাসী’ বা ‘একপক্ষীয়’ সম্পর্ক ছিল বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে সেই সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কেমন হওয়া উচিত?
ফরহাদ মজহার: ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কথাটাকে বিমূর্তভাবে বললে হবে না। ব্যবসার ক্ষেত্রে ভারত কাছে বাংলাদেশ একটা বাজার। নিচু একটা বাজার। তার পণ্যের বাজার। ফলে ভারতের সঙ্গে আমার সেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের চরিত্রটা শুধু যে আধিপত্যবাদী তা নয়, এটা একইসঙ্গে সে বাজার আকারে রাখতে চায়। এই সম্পর্কে তো রূপান্তর হতেই হবে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়ত, ভারতের যে হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং তার সঙ্গে সঙ্গে সে যেভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য তার উদ্যোগ; তার মানে সে অলরেডি যে মডেলটা ফলো করে, তার বিজেপি মডেল এটাকে অনেকে বলে ওয়েস্ট ব্যাংক মডেল, মানে এটা হলো একটা ইসরায়েলি মডেলের মতো। মানে আপনি একটা ভারত হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র বানাতে চান, যেটা হোমোজেনিয়াস। ভারতের দিক থেকে এই হিন্দুত্ববাদটা এভাবে হাজির হচ্ছে যেটা আমাদের জন্য বিপজ্জনক। ফলে তার সঙ্গে আমার ইডিওলজিক্যাল এবং কালচারাল লড়াই আছে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে তার ও আমার অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্পর্ক অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। এটা তো কমাতেই হবে।
আর আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে অবশ্যই বাংলাদেশের সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। আপনার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী দরকার। কিন্তু সবার আগে দরকার আপনার অর্থনৈতিক শক্তি। আপনি যদি আপনার দেশকে ভারতীয় বাজারে পরিণত করেন, তো আপনি কী করে আশা করেন যে আপনি ভারতের কাছ থেকে বাঁচবেন? এটা তো আপনি করেছেন কানেক্টিভিটি বা চুক্তি।
তাহলে আসুন আমরা ভারতের সঙ্গে যে সকল চুক্তি রয়েছে, যা আমাদেরকে মূলত ভারতের বাজারে পরিণত করেছে, সেই চুক্তিগুলোর দিকে দৃষ্টি দিয়ে সেই সম্পর্কগুলোকে আমরা বদলাই। আমাদের এটাই সবচেয়ে ভালো হবে।
এশিয়া পোস্ট: আমেরিকা-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানি জনগণের নেতৃত্বে যুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তা কেবল একটি রাষ্ট্রকে নয়—একটি বৈশ্বিক অন্যায় ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে কি না?
ফরহাদ মজহার: অবশ্যই ইরান সারা পৃথিবীর মজলুম জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে এই যুদ্ধটা করছে। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত না যে, ইরান ১৯৭৯ সালে একটা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পারস্য সভ্যতা অত্যন্ত প্রাচীন একটি সভ্যতা।
ট্রাম্প যখন বলে যে এই সভ্যতা আজকে ধ্বংস হবে, এই যে ভয়াবহ একটা কথা ট্রাম্প বলতে পেরেছে এবং তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই ইরানি জনগণ প্রতিরোধ করেছে। এটা তো অসম্ভব ঘটনা। এটা তো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা।
সেই ক্ষেত্রে ইরানি জনগণের পক্ষে পক্ষে আমাদের অবশ্যই নিঃশর্তে তাদের পক্ষে থাকা উচিত। কারণ, আমরা ইরানি জনগণের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে ভুরাজনৈতিক যে পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে সারা পৃথিবীতে, তার ইতিবাচক ফল কিন্তু আমরা ভোগ করব।