Image description

নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে তুমুল বিরোধিতা দেখা গেলেও সরকার গঠনের পর থেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দল দুটি সরকার ও বিরোধী আসনে থাকলেও তাদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘বোঝাপড়া আছে’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ও আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়েও দুপক্ষের অঘোষিত ঐক্য দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার মাঝে বৈঠক, জ্বালানি ইস্যু, বিরোধী এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে বিচার-সালিশ ও হাঁট-বাজারের ইজারাসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে দুইপক্ষের মধ্যেই এক ধরনের সমন্বয় রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একটি অংশ। তারা বলছেন, দুই দলের দৃশ্যমান বিরোধিতা দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে ঐক্য ঠিকই আছে। 

ক্ষমতাসীন বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের সঙ্গে মিত্রতা ছিল দীর্ঘদিনের। গত দুই দশক রাজপথ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই ছিল তাদের দহররম-মহররম সম্পর্ক। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দলেরই পথ হয়ে যায় আলাদা। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় দুই দলের শীর্ষ নেতারাই একজন আরেকজনকে লক্ষ্য করে অভিযোগের তির ছোড়েন। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, আবার জামায়াতের নেতারা বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন। রাজধানী থেকে তৃণমূল পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তবে নির্বাচনের পর এ চিত্রের অনেকটা পরিবর্তন ঘটে।

‘আমরা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করবো না। সরকারের ভালো কাজেরও প্রশংসা করবো,’ সম্প্রতি বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের এমন বক্তব্যের পর এ ধরনের আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

অবশ্য দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন ঐক্য সময়োপযোগী বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের ব্যাংকিং খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতি ভঙ্গুর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট—সব মিলিয়ে দেশের অবস্থা ভালো নয়। তাই দেশের স্বার্থে সরকার যদি বাণিজ্যিক কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চায়, সেটি ইতিবাচক হলে অবশ্যই বিরোধী দলের সহযোগিতা করা উচিত। আর আওয়ামী লীগ প্রশ্নেও তাদের বোঝাপড়া থাকা দরকার। কারণ দুইপক্ষই বিগত দিনে নির্যাতিত হয়েছে। তাই দেশের প্রয়োজনে সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্য জরুরি।’

জ্বালানি সংকট নিয়ে ঐক্যের সূচনা

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি থেকেই দেশে জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করে। প্রতিটি পাম্পেই ছিল যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। এ নিয়ে যখন অচলাবস্থা বিরাজ করছিল, তখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য তৈরি হয়।

গত ২৪ এপ্রিল সংসদের ২০তম অধিবেশনে দুপক্ষের মধ্যে কমিটি গঠন করা হয়। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সারা দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কথা বলার আগ্রহ জানিয়ে স্পিকারের কাছে বার্তা পাঠান তিনি। বক্তব্যে তুলে ধরেন ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের মাধ্যমে আলোচনা করার। পরে বিদ্যুৎ জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে প্রধান করে সরকার দলের ৫ সদস্যের নাম ঘোষণা করেন সংসদ নেতা।

এদিকে, বিরোধী দল থেকেও পাঁচ সদস্যের নাম চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে পাঁচ সদস্যের তালিকা দেয় বিরোধী দল। এসব কমিটির কারণে এ সংকট নিরসন হয় বলে দুই পক্ষেরই দাবি।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে অভিন্ন অবস্থান

জুলাইয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনও সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গত বছর ওই অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেখানেও সরকার ও বিরোধী দলের তেমন দ্বিমত নেই।

গত ৯ এপ্রিল দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস করা হয়। এই অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। এতে কোনও সত্তাকে নিষিদ্ধের পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও এই আইনে থাকছে। আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনও ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধের বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান ছিল না। ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। সেখানে জামায়াতের আমির সংসদে আলোচনার কথা বললেও সরকারি দল এতে আগ্রহ দেখায়নি। আর বিরোধী দলও তেমন জোরালো আপত্তি করেনি।

বাণিজ্যচুক্তিতে দুইপক্ষের সম্মতি নিয়ে আলোচনা

নির্বাচনের তিন দিন আগে করা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়েও সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের এক ধরনের ঐক্য রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে কথা উঠেছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের পক্ষ থেকে সংসদে আলোচনা বা রাজপথে কোনও আন্দোলন না থাকায় এ ধরনের আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। বিরোধী দল যখন সংসদে এ সংক্রান্ত আলোচনা উপস্থাপন করেনি, সেখানে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা আলোচনা করতে চাইলেও সুযোগ দেয়নি সরকারপক্ষ। তবে এই চুক্তিতে নিজেদের সম্পৃক্ততা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে বিরোধী দল জামায়াত।

সর্বশেষ গত ১৬ মে রংপুরে দলীয় কর্মসূচিতে এ নিয়ে মুখ খোলেন দলটির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে কোনও একজন মানুষও এ বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে একটি শব্দ উচ্চারণ করেনি। এটাই হচ্ছে আমাদের ওপিনিয়ন।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘তথাকথিত বিরোধী দল যতই সরকারের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করুক, দেশের মানুষের তা বোঝার বাকি নেই। তারা মূলত ‘আমরা আর মামুরা’ টাইপের সরকার চালাচ্ছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বাণিজ্যচুক্তিতে দুইপক্ষেরই সম্মতি ছিল। আমাদের বিশ্বাস—তারা এ নিয়ে জবাবদিহি করবে না। তাই রাজপথে বিরোধী দল হিসেবে আমাদেরই ভূমিকা রাখতে হবে।’’

দুই ধরনের ব্যাখ্যা নেতাদের

সরকার ও বিরোধী দল আসলে কি লিয়াজোঁ রক্ষা করে চলছে? এমন প্রশ্নে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের সহযোগী। অথচ বাইরে বিরোধিতার অভিনয় করছে। এতে জনগণের অধিকার বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা থাকবে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারকে ছাড় দিচ্ছি না। তবে ইতিবাচক কাজের প্রশংসা করলেও যেকোনও অন্যায় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সংসদ ও রাজপথে আমাদের ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।’

তবে ভিন্ন কথা বলছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সরকার তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। জনগণের স্বার্থবিরোধী কোনও পদক্ষেপ এখনও পর্যন্ত নেয়নি। আর বিরোধী দল কখন কী অবস্থান নেয়, সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।’