Image description

দেশের আবাসন খাত এখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছে আবাসন কোম্পানিগুলো। একই সঙ্গে রড, সিমেন্ট, বালি, ইট, পাথরসহ প্রায় ২৬৯টি নির্মাণ উপকরণের বাজারেও চলছে মন্দা। বিক্রি কমে যাওয়ায় পুঁজি হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের        উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা ও নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে আবাসন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। আবার চলমান প্রকল্পও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এমন মন্দাবস্থা থেকে উত্তরণে এই খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য নীতি সহায়তা জরুরি। সেই সঙ্গে আবাসন ক্রেতাদেরকে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রিহ্যাবের তথ্য মতে, পুরো শিল্প খাতে মাসিক বিক্রি ১ হাজার থেকে কমে ২৫০-৩০০টিতে নেমে এসেছে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল, সেখানে উল্টো স্থবির হয়ে পড়েছে। কিছু প্রকল্পে ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমতে দেখা গেছে। বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসুন্ধরা, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডিতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবাসন বা রিয়েল এস্টেট খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ। এ খাত যদি সংকটে পড়ে, তাহলে পুরো অর্থনীতিই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। জিডিপিতে ১৮ শতাংশ অবদান রাখা এ খাত বর্তমানে নানা কারণে মন্দার সম্মুখীন। রড, সিমেন্ট, ইট, বালি ও পাথরের মূল্য প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই বছরে বিক্রি নেমেছে অর্ধেকে। বাংলামোটর টাইলস মার্কেটের জান্নাত এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মো. জিয়াদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত আড়াই বছর ধরে ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার টাইলস বিক্রি হতো, এখন সেখানে দিনে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন ক্রেতাই পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট বা বিল্ডিং নির্মাণের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮-৯ তলা দালান নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন সেটি ৫-৬ তলায় সীমিত। ফলে জমির মালিকরা তাঁদের জমি আবাসন কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।  এ বিষয়ে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, এখন পুরো খাতটাই চাপের মধ্যে আছে। বিক্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে। নতুন প্রকল্প গ্রহণও কমেছে। ফলে শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণ উপকরণের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার ব্যবসায়ীও সংকটে। বিক্রি না থাকায় অনেকের পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়েছে, নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু ক্রেতা কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে আবাসন ও নির্মাণ উপকরণ খাতের জন্য বিশেষ নীতি সহায়তা দরকার।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, রং, ইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ ও স্যানিটারি পণ্যের বাজার। আবাসন খাতের মন্দা সরাসরি এসব শিল্পেও প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আমিরুল হক বলেন, সিমেন্ট শিল্পে মন্দাভাব চলছে। চাহিদা না থাকায় সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ কম উৎপাদন করছে। নির্মাণ উপকরণ খাত এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। ব্যবসা সচল রাখতে হলে সহজ শর্তে ঋণ ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। দেশের বড় বড় শিল্পগ্রুপের ক্ষতি হলে আগামীতে কোনো শিল্প গড়ে উঠবে না। নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে দুই কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। বর্তমানে ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করাও কঠিন। তবে অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং গভর্নরের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোতে আমি আশাবাদী। শিল্প খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যতগুলো সার্কুলার করেছে গত ১০-১৫ বছরের কোনো গভর্নর তা করেননি।

আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা জানান, একই সঙ্গে এলসি খোলার জটিলতা ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে কাঁচামাল আমদানিও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, শুধুমাত্র আবাসন কোম্পানিকে নয়, নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীদের জন্যও বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে কম সুদে ঋণ, কর ছাড় এবং সহজ অর্থায়নের সুযোগ দিলে খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, আবাসন খাতে স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে ইস্পাত শিল্পে। রডের উৎপাদন কমে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রাখা যাবে না। চাহিদা না থাকায় উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমাতে বাধ্য হয়েছি আমরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে খাতটিকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন। আবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্মাণ উপকরণের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বাজার তদারকি বাড়ানো এবং উৎপাদন ও আমদানিতে নীতিগত সুবিধা দেওয়াও জরুরি। তা না হলে আবাসন খাতের বর্তমান সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সুদহার ছিল ১৪ শতাংশ। নীতি সহায়তা ও স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতও ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ রয়েছে। মহামন্দার ফলে ২০০৩ সালে ঋণের সুদহার ১ শতাংশে নেমেছিল। এতে বাড়ি বিক্রির হার তুঙ্গে উঠেছিল। এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণে দেওয়া ঋণের সুদহার বেশি হওয়ার কারণেও গ্রাহকরা ব্যাংকবিমুখ হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবাসন খাতে ঋণ দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কারণ এ খাতে ঋণের মেয়াদ দীর্ঘ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই নগণ্য। সরকারি-বেসরকারি মাত্র তিনটি বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আবাসন খাতে ঋণ দেয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলো ঋণ দিলেও সেটির সুদহার বেশি। সরকার উদ্যোগী হলে আবাসন খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। এ মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের নীতিরও দায় আছে।