অসুস্থ শরীর। অসহায় চাহনি। কাউকে দেখলে ভাবছে, এই এলো বুঝি ব্যথা দিতে। কারও হাতে আবার কারও পায়ে ক্যানোলা। কারও মুখে অক্সিজেন মাস্ক। কারও নাকে নল। কারও চলছে স্যালাইন। এদিক-ওদিক শুধু কান্নার শব্দ। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৬ষ্ঠ তলায় হামে আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ডে এমন চিত্র এখন নিত্যদিনের। এখানকার সাধারণ বেডগুলো রোগী দিয়ে পূর্ণ। চলাচলের রাস্তায়ও রোগী রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও অন্যান্য ইউনিটের ফাঁকা বেডগুলোয় হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখা হয়েছে। ভেতরে সন্তানের চিকিৎসা চলছে।
বাইরে অনেক মানুষ বিছানা করে শুয়ে আছেন। তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। যদিও রোগীর চাপ অনেকটা কমেছে। কয়েকদিন আগে আরও বেশি চাপ ছিল। ইউনিটের বাইরে অনেক মানুষ পাটি বিছিয়ে শুয়ে আছেন। দেখেই বোঝা যায়, রাতে ঠিকমতো ঘুমাননি। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে অজানা ভয় আর আতঙ্ক। আদরের ছোট্ট শিশুটি অসুস্থ। অর্থ সংকট। ১৬ নম্বর বেডে মুখ ভার করে বসে ছিলেন রিকশাচালক ইব্রাহিম। হামে আক্রান্ত ছেলের নাকে অক্সিজেনের নল। প্রতিনিয়ত অক্সিজেন দিয়ে রাখা হচ্ছে। ভোলা সদর উপজেলার বাপতা ইউনিয়নের বাসিন্দা ইব্রাহিম। ঢাকায় রিকশা চালান।
গত ১ মাস ধরে ছেলেকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। বন্ধ হয়েছে আয়-রোজগার। ৭ মাস বয়সী ফারহাবিবকে নিয়ে ৪টি হাসপাতালে ঘুরেছেন। সর্বশেষ সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আরও এক মাস থাকতে হতে পারে হাসপাতালে। এ অবস্থায় ইব্রাহিম এখন নিজে লড়ছেন অর্থের সঙ্গে। এক মাসে অনেক টাকা ধার করে ফেলেছেন তিনি। এতো টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন তা নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। ছেলেকে পুরোপুরি সুস্থ করতে প্রয়োজন আরও টাকার।
মো. ইব্রাহিম মানবজমিনকে বলেন, ১ মাস আগে ফারহাবিবের বসন্ত উঠে। সঙ্গে জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ছিল। তখন তাকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে ৫ দিনের মতো ভর্তি ছিল। চিকিৎসকরা জানান, ছেলে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এ ছাড়াও শরীরে হাম উঠেছে। পরে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। প্রথমে রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকায় শিশু হাসপাতালে নিয়ে যাই। অর্থের অভাবে সেখানে চিকিৎসা করাতে পারিনি। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে ৫ দিন চিকিৎসার পর আমাদের ছেড়ে দেয়। বাড়িতে নিয়ে গেলে ফারহাবিব ফের অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর আবারো তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেও চিকিৎসা খরচ মেটাতে পারছিলাম না। পরে সবার পরামর্শে ছেলেকে নিয়ে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করি।
এখন হাম ভালোর দিকে। কিন্তু ছেলের ঠান্ডা লেগেই আছে। নিয়মোনিয়া ভালো হয়নি। নিঃস্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। সবসময় অক্সিজেন লাগানো থাকে। ছেলেটা কয়েকদিন সেলাইনের ওপর ছিল। এখন একটু বুকের দুধ খাচ্ছে। ভালো কিছু কিনে খাওয়ানোর মতো টাকা নেই আমার কাছে। ডাক্তার বলেছেন, ভালো হলে কিছু টেস্ট দিবে। বর্তমানে আমার কাছে ওষুধ কেনার মতো টাকা নাই। হাসপাতাল থেকে ফ্রিতে যা দেয় তাই চলে। এখন টেস্টগুলো কীভাবে করবো জানি না।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি কল্যাণপুর এলাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। ছেলেকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছি। এ সময়ে আমার কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ ঢাকায় এসে দেখবে এমন মানুষও নেই। আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ। মানুষের কাছে ধারদেনা করে ছেলের চিকিৎসা করছি। নিজে কিছু কিনে খাবো তার মতো টাকা নেই। হাসপাতাল থেকে যা খাবার দেয় তাই স্বামী-স্ত্রী ভাগ করে খাই। আজ দুপুরে কিছু খাইনি। হাসপাতালের খাবার স্ত্রীকে দিয়েছি। গতকালের একটু পান্তা আছে।
এটুকুই খেতে হবে। এখন পর্যন্ত মানুষের কাছে অনেক টাকা ধার হয়ে গেছি। মানুষ আর কতো দিবে? গ্রামে বাড়িভিটা ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। ইব্রাহিম বলেন, ভাবলাম মহাখালী এলাকায় রিকশা চালাবো। এজন্য বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে কেউ রিকশা দেয়নি। পরিচিত ছাড়া কেউ রিকশা দেয় না। কল্যাণপুর গিয়ে রিকশা চালানোও সম্ভব না। তখন এখানে দেখার মতো কেউ থাকবে না। স্ত্রী একা সামলাতেও পারবে না। দু’টো ছেলেমেয়েকে পরিচিত একজনের কাছে রেখে এসেছি। তারাও আসার জন্য কান্না করে। কিন্তু তাদেরকে গিয়ে দেখে আসার মতো অবস্থাও নেই আমার। কীভাবে কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।