বাংলাদেশে সার নিয়ে ‘রাজনীতি’ নতুন কিছু নয়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সার ডিলারশিপের কাঠামো। আগের সরকারের আমলে যাদের ডিলার ও সাব-ডিলারশিপ দেওয়া হয়, পরবর্তী সরকার প্রায়ই সেগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় বাতিল করে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ডিলার ও সাব-ডিলার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং কৃষকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করেন, যার ফলে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়তে হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশে সার কখনোই শুধু কৃষি উপকরণ ছিল না, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটরাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সার বিতরণ ব্যবস্থার রদবদল হয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থেকেছে কৃষক, ডিলার নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রশ্ন। ফলে সেখানে কৃষি উপকরণের ডিলাররাই হয়ে উঠে গ্রামীণ রাজনীতির মধ্যস্বত্বভোগী।
সংকট ও রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস
গত কয়েক দশকে প্রায় প্রতিটি সরকারই কোনও না কোনও সময় সারের সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। ১৯৯৫ সালের ইরি-বোরো মৌসুমে বিএনপি সরকারের আমলে তীব্র সার সংকট দেখা দেয়। ন্যায্যমূল্যে সার ও কৃষি উপকরণের দাবিতে কৃষকরা আন্দোলনে নামেন। ওই বছরের ১৫ মার্চ আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলিতে টাঙ্গাইল ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৮ জন কৃষক নিহত হন। পরে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো দিনটিকে ‘কৃষক হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছিল।
এরপর থেকেই সার বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির একটি স্থায়ী ইস্যুতে পরিণত হয়। কাকতালীয়ভাবে প্রায় তিন দশক পর আবারও বিএনপি ক্ষমতায় এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের একাংশ সার সংকটের অভিযোগ তুলছেন।
নতুন ডিলার নিয়োগ ও নীতিমালা বিতর্ক
একসময় সার বিতরণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। পরবর্তী সময়ে এ দায়িত্ব ধাপে ধাপে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অধীনে চলে যায় এবং ডিলারশিপ ব্যবস্থার মাধ্যমে সার বিতরণ কার্যক্রম বেসরকারি পর্যায়ে সম্প্রসারিত করা হয়। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সার বিতরণ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা বাড়ে।
বিভিন্ন সময়ে নীতিমালা পরিবর্তন ও সংশোধন করা হলেও সার বিতরণ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ডিলার নিয়োগ ও লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টিও অনেক সময় রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এরইমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী খুচরা সার বিক্রেতা বা সাব-ডিলারদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে খুচরা বিক্রেতারা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে কৃষিমন্ত্রী ও সচিব বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। দাবি পূরণ না হলে আগামী ৩১ মে’র পর কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর সূত্র জানায়, ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা–২০২৫’ অনুযায়ী নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে, যা ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
নতুন নীতিমালার প্রধান শর্তগুলো হলো— আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক। এক পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ বাতিল। কমপক্ষে ৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম থাকতে হবে। ব্যাংক সনদের মাধ্যমে আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
সরকার বলছে, ডিলার নিয়োগে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হবে না। নতুন ব্যবস্থায় ডিলাররা সরাসরি কৃষকের কাছে সার বিক্রি করবেন। ফলে সাব-ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা প্রথা কার্যত বিলুপ্ত করা হচ্ছে। অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি, সক্রিয় রাজনীতিবিদ, সরকারি চাকরিজীবী কিংবা নির্বাচনে অযোগ্য ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পাবেন না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি ইতোমধ্যে তালিকা যাচাই শুরু করেছে।
বাজারে মূল্যবৈষম্য ও কৃষকের অভিযোগ
সরকারি সূত্রের দাবি, জ্বালানি সংকটের অজুহাতে কিছু ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য করছেন।
সরকার নির্ধারিত ৫০ কেজি ইউরিয়া সারের মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও অনেক এলাকায় কৃষকদের ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) সার না পাওয়ার অভিযোগও করছেন কৃষকেরা। তারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় অনেক স্থানে দ্রুত সার শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সার পাচ্ছেন না।
কৃষি অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত দেশের মোট সারের চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়, বাকিটা আমদানিনির্ভর।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ লাখ টন ইউরিয়া মজুত রয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ের ডিলারদের কাছে আরও প্রায় ৬০ হাজার টন সার রয়েছে। চাহিদা পূরণে নতুন করে ৫ লাখ টন সার আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে— যার একটি অংশের টেন্ডার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিবাদ
খুচরা সার ব্যবসায়ীদের অনুমোদন বাতিলের প্রতিবাদে গত ১১ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। পরে খুচরা সার বিক্রেতা অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কেএসবিএবি) কৃষিমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ৪৪ হাজার নিবন্ধিত বিক্রেতার কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং ২০২৫ সালের নতুন নীতিমালা বাতিল করতে হবে। সংগঠনের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে অনুমোদিত বিক্রেতারা দেশের প্রায় ৫ কোটি কৃষকের কাছে সার সরবরাহ করে আসছেন।
সংগঠনের সভাপতি মো. ফোরকান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে বিপুল বকেয়া অর্থ আদায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ব্যাংক ঋণে পরিচালিত ব্যবসা বন্ধ হলে হাজারো বিক্রেতা ঋণখেলাপিতে পরিণত হতে পারেন এবং ৪৪ হাজার পরিবারসহ কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।’’
কৃষি অধিদফতরের বক্তব্য
সার সরবরাহ, পুরোনো ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল এবং নতুন নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে কৃষি অধিদফতরের সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চললেও বিদ্যমান নীতিমালা এখনও বাতিল হয়নি এবং সার বিতরণ স্বাভাবিক রয়েছে।’’
তিনি জানান, আগের ডিলাররাই বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রথমে মার্চ পর্যন্ত, পরে এপ্রিল এবং সর্বশেষ ৩১ মে পর্যন্ত তাদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। নতুন নিয়োগ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ডিলাররাই দায়িত্বে থাকবেন। তার দাবি, দেশে বড় ধরনের সার সংকটের আশঙ্কা নেই। কোথাও সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলেও সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রীর আশ্বাস
জাতীয় সংসদে গত ৩১ মার্চ কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, দেশে ইউরিয়া সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং জুন-জুলাই পর্যন্ত সংকটের আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, ‘কাতার ও সৌদি আরব থেকে সার আমদানি জোরদারে সরকার কাজ করছে। একইসঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিসহ সার আমদানির ব্যবস্থাপনা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে কৃষক ও অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হয়।’