Image description

দরজায় কড়া নাড়ছে কোরবানি ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে পোশাক কেনা থেকে শুরু করে পশু কেনার প্রস্তুতিও নিয়েছেন অনেকে। আর এই ঈদকে ঘিরে সক্রিয় হয়েছে জাল টাকার কারবারিরা। কারণ দুই ঈদকে ঘিরে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের হাতে কম বেশি টাকা আনাগোনা থাকে। এ সময়টা গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের বাজারে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি ব্যবসা-বাণিজ্য হয়। এ ছাড়া কোরবানি ঈদে পশুর হাটে শতকোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাল টাকা বাজারে ছড়ানোর পাঁয়তারা করছে জাল টাকার কারবারিরা। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জাল টাকার কারবারিরা ধরা পড়েছে। তাদের কাছ থেকে ঈদ বাজারে জাল টাকা নিয়ে পাঁয়তারার কথা জানতে পেরেছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তারপর থেকে বেশ নড়েচড়ে বসেছেন পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দারা। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। জাল কারবারের সঙ্গে আগে থেকে যারা জড়িত ছিলেন তাদেরকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। কারণ ইতিমধ্যে যারা গ্রেপ্তার হয়ে জেল থেকে জামিনে বের হয়েছেন তারা আবার একই কারবারে জড়িয়েছেন।

গোয়েন্দা সূত্র ও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে কোটি কোটি টাকার জাল নোট ছড়ানোর পাঁয়তারা করে তারা ছাপানোর কাজও সেরেছে। তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক টাকাই বাজারে ছড়িয়েছে। তবে ব্যাপকভাবে ঈদের এক সপ্তাহ আগে ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। তবে বারবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার কারণে এসব চক্রের হোতারা তাদের কৌশল পাল্টেছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে ধরাও সহজ হচ্ছে। এ ছাড়া এসব চক্র এখন অনলাইন হোম ডেলিভারি সার্ভিসের মাধ্যমেও কেনাবেচা করছে।

এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিজ্ঞাপন দিয়ে জাল টাকা বিক্রি করছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ প্রিন্টারে প্রিন্ট দেয়ার পর কাগজকে জলছাপ দিয়ে, ফুয়েল কাগজ ও বিশেষ গামের মাধ্যমে খুব সহজেই তৈরি হচ্ছে জাল নোট। চক্রের সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে এত নিখুঁতভাবে জাল নোট তৈরি করে সেটি শনাক্ত করা সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। এতই সূক্ষ্ম যে আসল না কি নকল সেটা কারও পক্ষে বোঝা কঠিন। তারা জাল টাকার ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকার বড় নোট প্রিন্ট করে। কারণ, এতে লাভ বেশি। জাল টাকা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারজাত পর্যন্ত কয়েকটি ভাগে কাজ করে চক্রের সদস্যরা।

গত সপ্তাহে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির সরঞ্জামসহ দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৩। গ্রেপ্তাররা হলেন- কামরুল ইসলাম ও নিষাদ হোসেন। তাদের কাছ থেকে ৪০টি ৫০০ টাকার ভুয়া নোট উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব-৩ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, ঈদকে টার্গেট করে জাল নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। একই দিন রাজধানীর উত্তরার বিডিআর মার্কেট ও গাজীপুরের বাসন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩ কারবারিকেও গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলেন- মজিবুর রহমান, দুলাল মৃধা ও মো. মামুন। এ সময় ৩৪ লাখ জাল টাকাসহ জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডিবি পুলিশকে জানিয়েছে, একই কারবারের জন্য এর আগেও তারা গ্রেপ্তার হয়েছিল। ধরা পড়ার আগে ১০ লাখ টাকার একটি চালানও তারা ডেলিভারি দিয়েছে। জাল টাকা তৈরির যেসব সরঞ্জাম সেগুলো তারা বিভিন্ন দোকান থেকে সহজেই সংগ্রহ করতো। গত ১লা মে রংপুরের পীরগাছায় জাল টাকার নোটসহ দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ৩রা মে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় জাল টাকাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৫ই এপ্রিল রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা থেকে ৪০ লাখ টাকার জাল নোটসহ আলী আজগর সিকদারকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। গত ১২ই এপ্রিল গুলশান থেকে ৫০ লাখ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে আটক করে পুলিশ। গত ৫ই মার্চ তুরাগ থেকে ২৫ লাখ টাকার জাল নোট এবং তৈরির সরঞ্জামসহ মাইলস্টোনের দুই শিক্ষার্থীকে আটক করেছে র‌্যাব। গত দেড় মাসে সারা দেশে আরও বেশ কয়েকজন কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগে যেখানে ১০০টি পাঁচশো অথবা ১ হাজার টাকার নোট তৈরিতে খরচ হতো কমপক্ষে চার থেকে সাত হাজার টাকা। বর্তমানে খরচ হয় মাত্র আড়াই হাজার টাকা। আগে তৈরি খরচ বেশি হওয়ায় পাইকারি মার্কেটে লাখ টাকার নোট বিক্রি হতো ৮-১৫ হাজার টাকায়। কিন্তু বর্তমানে পাইকারি বাজারে লাখ টাকার নোটের দাম মাত্র ৬ হাজার টাকা। ক্রেতা বুঝে লাখ টাকার নোট ৮-১০ হাজার টাকাতেও বিক্রি করা হচ্ছে। এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা নতুন নোট জাল কারবারিদের কাজ আরও সহজ করে দিয়েছে। নোটের ডিজাইনে ত্রুটি, নিম্ন্নমানের গ্রাফিক্স ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের সংযোজনের অভাবে নোটটি জাল করা খুবই সহজ করে দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এবার সারা দেশে ৪ হাজার ২৫৯টি পশুর হাট ইজারা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি হাট থাকবে। হাটগুলোতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জাল নোট শনাক্তে প্রতিটি হাটে ব্যাংকগুলোর বুথ ও মেশিন থাকবে। সমপ্রতি সংসদ অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশে জাল নোটের বিস্তার রোধে সরকার একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরির কাজ করছে। প্রস্তাবিত এ আইনে জাল নোট তৈরি বা আসল মুদ্রার আদলে কিছু তৈরির সঙ্গে জড়িতদের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে।

১৪ই মে ডিএমপি’র ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেছেন, আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা চক্রের বিষয়ে আমরা মনিটরিং করছি। এই মনিটরিংয়ের মধ্যেই আমরা জানতে পারি জাল টাকা তৈরি ও বিক্রয়ের চোরাকারবারির একটি দল উত্তরা পূর্ব থানাধীন সমবায় বাজার (বিডিআর) মার্কেটের সামনে জাল টাকা কেনাবেচা করছে। এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে মো. মজিবুর রহমানকে চার লাখ টাকার জাল নোট ও জাল টাকা বিক্রয়ের ৪০ হাজার আসল টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকালে আসামিদের হেফাজত থেকে আরও ৩০ লাখ জাল টাকা, জাল টাকা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি ল্যাপটপ, তিনটি কালার প্রিন্টার, একটি রোল সোনালী রংয়ের ফয়েল পেপার, ২০০টি সিকিউরিটি ট্যাগ ও জলছাপ সম্বলিত সাদা কাগজ, ১০০টি একপাশে ১০০০ টাকার প্রিন্ট করা কাগজ অপর পাশে সাদা, দুই লিটারের দুইটি তরল জাতীয় গাম, একটি কাটার এবং জলছাপ বসানোর দুইটি ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকা তৈরি করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রয় করে আসছে বলে স্বীকার করেছে। আর জাল টাকা বানানোর জন্য প্রিন্টিং প্রেস থেকে একজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছিল তারা। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, আসন্ন পবিত্র ঈদ-উল আজহা উপলক্ষে বিভিন্ন পশুর হাট ও বিপণিবিতানে তাদের তৈরিকৃত জাল টাকাগুলো তাদের বিভিন্ন সহযোগীর মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা রয়েছে। জাল টাকা কারবার সংক্লান্ত ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে।