Image description

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শনির দশা কাটছেই না। বিদেশে কর্মী প্রেরণ দিন দিন কমছে। নতুন শ্রমবাজারের খোঁজে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও পর্যাপ্ত সাড়া মিলছে না। দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারও আটকে আছে নানা শর্তে। সর্বশেষ ভরসা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারও যুদ্ধের ধাক্কায় টালমাটাল। কয়েক বছরের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠানো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সৌদি আরবের প্রতি ভরসা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। সংকট উত্তরণে নতুন শ্রমবাজারের খোঁজে বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৮ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অন্তত ৬৭ হাজার কম। ২০২৩ সালে সর্বাধিক ১৩ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেলেও পরবর্তী দুই বছরে এ সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ১০ লাখ ও ১১ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশে গেছেন দেড় লাখের অধিক কর্মী। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গত আড়াই মাসে এ সংখ্যা ১ লাখে এসে ঠেকেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা স্পষ্টতই ফুটে উঠেছে।

সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া সৌদি আরবের মেগা প্রকল্পগুলোতে যে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের আশা করা হচ্ছিল বিনিয়োগকারীদের আস্থার পতনের ফলে সেই সুযোগ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে শ্রমবাজার প্রায় ৫০ শতাংশ নিচের দিকে নেমে এসেছে। শুধু সৌদি আরবের বাজারটিই কার্যকরভাবে খোলা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ কর্মীর বিশাল সাপ্লাই চেইন বর্তমানে সৌদি আরবের বাজারের ওপর নির্ভর করে চলছে। আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার বা মালয়েশিয়ার মতো বাজারগুলো নিয়মিত সচল ছিল। যদি বাজার খোলার প্রক্রিয়া এক বা দুই বছর পিছিয়ে যায়, তবে বিদেশ থেকে কর্মী ফেরত আসার হার বেড়ে যাবে, যা দেশের একমাত্র লাইফলাইন রেমিট্যান্সে বড় প্রভাব ফেলবে। শ্রমবাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। বিগত কয়েক মাসে অন্তত ১৭টি দেশে এমওইউ পাঠিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এসব দেশের মধ্যে সার্বিয়া, রোমানিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, পর্তুগাল, স্পেন, মরিশাস, লেবানন, থাইল্যান্ড, ওমান, অস্ট্রিয়া, আলবেনিয়া, কম্বোডিয়াসহ ইউরোপের আরও বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে দেশগুলো থেকে মিলছে না পর্যাপ্ত সাড়া। অনেক দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি থাকলেও ডিমান্ড লেটার পাওয়া যাচ্ছে না। এর জন্য বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি অনাস্থাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়াও দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ১০ শর্তে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া সরকার। শর্তে সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়। এতে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। ফলে বাংলাদেশ সরকার সব এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত করার দাবি জানায়। দুই দেশের শর্তের বেড়াজালে আটকে আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ এই শ্রমবাজার। তবে গত মাসে শ্রমবাজারটি খুলতে মালয়েশিয়া সফর করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ার বাজার নিয়ে নানা জটিলতা ও শর্ত থাকলেও মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মী পাঠানো। এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে লোক পাঠানোর প্রক্রিয়া সচল করা উচিত। বর্তমান সরকার মালয়েশিয়ার বাজারটিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এ বিষয়ে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। বাংলাদেশ পরিকল্পনা করতে দেরি করলে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো সেই সুযোগ লুফে নেয়। বিগত সময়ে বাজার খোলার সিদ্ধান্তে দেরি হওয়ায় হোটেল ও রেস্টুরেন্ট সেক্টরে নেপালি কর্মীরা জায়গা করে নিয়েছিল। বর্তমান সরকার ইউরোপে নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা করছে।

তবে সেখানে ভাষাগত দক্ষতা এবং সার্টিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তার কারণে এটি বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। কারণ সাপ্লাই চেইন মূলত এখান থেকেই আসে। তিনি আরও বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে এই সেক্টরে প্রশাসক নিয়োগ করা আছে, যার ফলে বেসরকারি খাতের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নেই। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গেও বাজার খোলার বিষয়ে বেসরকারি খাতের তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। সরকারের উচিত নীতি নির্ধারণ এবং লেবার রাইটস (শ্রমিক অধিকার) রক্ষা করা, বাজার খোলার দায়িত্ব বেসরকারি খাতকে দেওয়া উচিত। তবে দেশের স্বার্থে যে মাধ্যমেই হোক না কেন, বিদেশগামী কর্মীদের প্রবাহ সচল রাখা প্রয়োজন। কর্মী পাঠানোর স্বচ্ছ পদ্ধতি এবং তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।