Image description
রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রী

খুলনার রূপসা এলাকায় গ্যাসভিত্তিক ৮০০ মেগাওয়াটের (মে.ও.) বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎমন্ত্রীকে ডেকে প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন, গ্যাস সরবরাহের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয়ে কীভাবে এত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলো।

এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রটি চালুর জন্য প্রস্তুত হবে সেপ্টেম্বরে। কিন্তু গ্যাসভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করতে গ্যাস আসবে কোথা থেকে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গ্যাসের ভয়াবহ সংকট চলছে। বর্তমানে দিনে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। আগামী তিন-চার বছরেও কেন্দ্রটিতে গ্যাস সরবরাহের কোনো উদ্যোগ নেই। কিন্তু গ্যাসের জন্য কেন্দ্রটি বন্ধ থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মাসে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) দিতে হবে ১০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে রূপসা কেন্দ্রটি দেশের জন্য অশনিসংকেত।

এই প্রেক্ষাপটে সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বিদ্যুৎ সচিবকে তার দপ্তরে ডেকে পাঠান এবং রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে রূপসা কেন্দ্রে বিকল্প উপায়ে হলেও গ্যাস সরবরাহের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিদ্যুৎমন্ত্রী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেছেন, রূপসা কেন্দ্রের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকার এক বছরের মধ্যে রূপসা কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ দিতে উদ্যোগ নেবে। বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, গ্যাস ছাড়া এভাবে প্রকল্প করে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের বড় ক্ষতি করে গেছে। এখন এগুলোর মাশুল দিতে হবে জনগণকে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি ৮৩৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে রূপসা কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে। এর মধ্যে এডিবি ঋণ দিয়েছে ৪১২ মিলিয়ন ডলার। এখন সরকারের কাছে এডিবির পক্ষ থেকে রূপসা কেন্দ্র চালুর ব্যাপারে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ওই কেন্দ্রে দেওয়ার মতো গ্যাস বা পাইপলাইন কোনোটিই নেই। জানা যায়, রূপসা প্রকল্প নিয়ে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০১৬ সালে অনেকটা জোর করে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে গ্যাস সরবরাহের একটি নিশ্চয়তাপত্র আদায় করা হয়েছে। এটির ওপর ভিত্তি করে এডিবি ঋণ দিয়েছে। তবে গত বছর এডিবির একটি দল বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেছেন। সেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা এডিবির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান-গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিতে কীভাবে এডিবি এ প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্তোষজনক জবাব এডিবি দিতে পারেনি। তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভারত থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে কুষ্টিয়া দিয়ে রূপসা পর্যন্ত ১৬০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এ কেন্দ্রের জন্য ভারতের একটি বেসরকারি কোম্পানি সেই দেশ থেকে গ্যাস সরবরাহ করার কথা। তবে এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনো অনুমতি ছিল না। রূপসা কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা না করেই ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়িয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে এডিবির ঢাকাস্থ এক সাবেক কর্মকর্তা (যিনি ভারতীয় নাগরিক) রূপসা প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগে অতি উৎসাহী ছিলেন।

রূপসা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আসাদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেছেন, এ কেন্দ্রের জন্য দিনে ৬ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস দরকার। কেন্দ্র বসানোর ঠিকাদার হচ্ছে চীনের সাংহাই ইলেকট্রিক। তারা এখন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরীক্ষার জন্য গ্যাস চাইছে। কিন্তু তাও পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক যুগান্তরকে বলেন, রূপসায় দেওয়ার মতো গ্যাস নেই। জাতীয় গ্রিড দিয়ে ভেড়ামারা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়। এরপর দেওয়ার মতো গ্যাস নেই। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিলে ভোলা ফিল্ড থেকে গ্যাস দেওয়া যাবে। তবে তা ৩ বছরের বেশি লাগবে।

ভোলার গ্যাস বরিশাল পর্যন্ত পাইপলাইনে নিতে ২ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। এটি কবে নাগাদ অনুমোদন হয়, তা কেউ জানেন না। এরপর বরিশাল থেকে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণে কোনো প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়নি। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে রূপসার বিদ্যুৎকেন্দ্রে কীভাবে গ্যাস যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর তাগাদার পর রূপসায় বিশেষভাবে গ্যাস সরবরাহে বুধবার একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে অল্প সময়ে পটুয়াখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে গ্যাস সরবরাহ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে ওই ভাসমান টার্মিনাল বসানো যায়। সেখান থেকে পাইপলাইনে রূপসা কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া যেতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ২ থেকে ৩ বছর লাগতে পারে। বুধবারের বৈঠকে অনেকে পরামর্শ দেন পটুয়াখালীতে না বসিয়ে মোংলায় সেই ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল বসানো যায় কিনা। বৈঠকে বলা হয়, মোংলায় সমুদ্রের ঢেউয়ের দুলুনি বেশি। তাই এখানে টার্মিনাল বসানো ঠিক হবে না।

এডিবির ওয়েব পেজের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। আর এডিবি এ প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন করে ২০১৮ সালে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটি চালুর কথা ছিল। কিন্তু নানা কারণে এটি এখনো চালু হয়নি। এডিবি তার প্রকল্প পেজে এই প্রকল্প নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।