Image description

হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তর প্রকল্পে বড় ধরনের লুটপাট হয়েছে। প্রকল্পটির ধাপে ধাপে এরকম অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষতচিহ্ন এখন স্পষ্ট। যুগান্তরের কাছে এমন অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন ট্যানারি মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দা। তারা বলেন, বুড়িগঙ্গাকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে সরকার ট্যানারিশিল্পকে সাভারে স্থানান্তর করার উদ্যোগ নেয়। পরিবেশসম্মত আধুনিক ট্যানারি স্থাপনে ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকার বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকল্পটির কাল হয়ে দাঁড়ায় ধীরগতি ও দুর্নীতি। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি জোড়াতালি দিয়ে শেষ হয় ২০২১ সালে। এ দীর্ঘ ১৯ বছরে প্রকল্পের পিডি বা প্রকল্প পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৮ জন। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রত্যেকে লুটপাটে ভাগ বসিয়েছে। এ কারণে ট্যানারিশিল্পটি দুর্নীতি ও দূষণের কবলে আক্রান্ত। বুড়িগঙ্গার পর এখন ধলেশ্বরীও দূষণে ধ্বংস হচ্ছে।

এদিকে ট্যানারিশিল্পের লুটপাটের প্রভাব পড়েছে চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে। শতভাগ কমপ্লায়েন্স না হওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কি গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ আনতে ব্যর্থ হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ট্যানারিশিল্প টিকে থাকতে পারছে না।

কারখানার মালিকরা বলেছেন, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি ক্ষুদ্র শিল্পের নকশায় স্থাপিত হয়, তাহলে সরঞ্জামের জন্য বরাদ্দ অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হবেই। এত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিসিকের পরিকল্পনা দিয়ে চলতে পারে না। নিয়ন্ত্রণই হয়েছে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প দিয়ে। সুফল আসবে কীভাবে? বিসিক ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প নিয়ে কাজ করে। কিন্তু চামড়াশিল্প কখনোই ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের আওতায় পড়ে না। আমাদের একেকটি যন্ত্রাংশের দামই ২ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকার বেশি। চামড়াশিল্পের একটি কারখানা স্থাপন করতে হলে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এটি কোনোভাবেই ক্ষুদ্র শিল্প নয়। চামড়াশিল্পকে বাঁচাতে হলে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সাভারের চামড়া-শিল্পনগরীতে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নির্গত হয়। কিন্তু বর্জ্য পরিশোধনাগারে যে ধরনের সিইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, সেটির সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার-তাও ঠিকমতো কাজ করে না। কারখানার বর্জ্য শোধনাগারে (সিইটিপি প্ল্যান্ট) নিতে পাইপ দেওয়ার কথা ৩০ ইঞ্চি, সেখানে স্থাপন করা হয়েছে ১৮ ইঞ্চি। যে কারণে বিষাক্ত বর্জ্যরে অধিকাংশই চলে যাচ্ছে নদীতে। ৩টি ক্রোমিয়াম (একধরনের রাসায়নিক) শোধনাগার থাকলেও যে সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে, এর একটিও কাজ করে না। অর্থাৎ প্রতিদিন ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হচ্ছে। প্রকাশ্যে এমন নদীদূষণ হলেও পরিবেশ নিয়ে কারও যেন মাথাব্যথা নেই। এভাবে চোখের সামনে বুড়িগঙ্গার পর ধলেশ্বরী নদীও দূষিত করে তোলা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এসব আধুনিক সরঞ্জাম স্থাপনে ৫০০ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। বাস্তবে নিুমানের সরঞ্জাম বসিয়ে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সর্বশেষ পরিচালক (পিডি) ড. জিতেন্দ্রনাথ পাল বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, পরিশোধনাগারের নকশা করেছে বুয়েটের প্রতিনিধিদল। তারা যে নকশা করেছে, সেভাবেই যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে চীনা কোম্পানি। স্থাপনা চালু অবস্থায় বুঝিয়ে দেওয়ার সময়ও বিশেষজ্ঞ কমিটি ছিল। পরিশোধনাগার চালু করে বুঝে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০০৩ সাল থেকে এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। আমি এই প্রকল্পের ১৮ নম্বর পিডি। ইকুইপমেন্ট সাপ্লায়ার (যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী) ভারত ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এ নিয়ে মামলাও হয়। উচ্চ আদালতের রায়ে শেষ পর্যন্ত চীনের কোম্পানি যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ পায়। আর সর্বশেষ পিডি হিসাবে আমাকেই বুঝে নিতে হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিুমানের পরিশোধনাগার সরবরাহের যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেটিও সঠিক নয়। নিুমানের হলে সেটি ১০ বছর চলছে কীভাবে। সমন্বিত নিয়ম মেনে পরিশোধনাগার পরিচালিত হলে ধারণক্ষমতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তাও তলিয়ে যাবে।

কারণ, নিয়ম মেনে তরল ও কঠিন বর্জ্য পাইপলাইনে ছাড়া হয় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জিতেন্দ্র বলেন, কারখানা থেকে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে কঠিন এবং তরল (ক্রোমিয়ামযুক্ত ও ক্রোমিয়ামবিহীন) বর্জ্য দুই পরিশোধনাগারে যাওয়ার কথা। এখন কারখানার মালিকরা যদি একই লাইনে তরল ও কঠিন বর্জ্য ছেড়ে দেন, তাহলে সমস্যা সমাধান হবে না। এছাড়া কারখানার বর্জ্য অন্তত ৪৮ ঘণ্টা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা। মালিকরা সেটিও মানছেন না।

২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটি হাতে নেয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ১৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখে প্রকল্পটির কাজ শুরু করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। এরপর দ্বিতীয় দফায় ব্যয় বাড়ানো হয়। ২০১৭ সালে তৃতীয়বার সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় নতুন করে অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে নতুন করে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ১৯৪ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর স্থাপিত সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে প্লটের সংখ্যা ২০৫টি।

সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ২০২১ সালে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিইটিপিকে যে অবস্থায় রেখে গেছে, বর্তমানে তা ওই অবস্থায়ই রয়েছে। তারা শতভাগ কাজ করে যায়নি। তখন থেকে বর্জ্য শোধনাগার শতভাগ কাজ করছে না। বর্জ্য পরিশোনাগারে নতুন করে কোনো কাজ না হওয়ায় এর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। চামড়া প্রসেসিং বর্জ্য সাধারণত ২০ থেকে ২৫ হাজার কিউবিক মিটার চাপ হয়ে থাকে। ঈদের সময় তা বেড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার কিউবিক মিটারে বেড়ে যায়। এ সময় ক্যাপাসিটির তুলনায় বেশি চামড়া প্রসেস হওয়ার কারণে আমাদের পক্ষ থেকে আরেকটি শিল্পনগরী গড়ে তোলা এবং নতুন করে আরেকটি সিইটিপি তৈরির প্রস্তাব ছিল। কিন্তু সরকার একসময় প্রস্তাবটি নিয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বর্তমানে তা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তার মানোন্নয়নে কাজ করা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) প্রশিক্ষক খন্দকার সালাম বলেন, ট্যানারিশিল্পের বিভিন্ন শিফটে ১৬ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। অথচ শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। নেই পরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থাও। এমনকি কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। জরুরি অগ্নিনির্বাপণের জন্যও কোনো জলাধার নেই। নারী শ্রমিকদের জন্য জন্য কোনো সুবিধা নেই। মসজিদ বা কোনো উপাসনালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। অদূরদর্শী পরিকল্পনায় এই শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রিন সিটি বলা হলেও সবুজায়নের পরিকল্পনাও এর মধ্যে নেই। বিদ্যুতের লাইন অভারহেড (ওপর থেকে) নেওয়ার কারণে গাছ লাগানোর সুযোগও রাখা হয়নি। কারখানার বাইরে জায়গা আছে; কিন্তু বিদ্যুতের তারের কারণে গাছ লাগাতে পারেন না কারখানার মলিকরা। যে কারণে সবুজায়ন সম্ভব হবে না। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ব্যবসায়ীদের বিপুল বিনিয়োগও কাজে লাগেনি। ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর বিষাক্ত পানি বর্ষায় মেঘনায় মিশে যাচ্ছে। এ কারণে শিল্পাঞ্চল টঙ্গী, হেমায়েতপুর, নারায়ণগঞ্জ হলেও নদীদূষণের প্রভাব পড়েছে বড় নদীগুলোয়। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা না হলে নদনদীর মাছের মাধ্যমে রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব মানুষের শরীরে প্রবেশের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাবে।

কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা ওবায়দুর রহমান বলেন, কওমি মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানার একটি বড় আয় কুরবানির চামড়া থেকে সংগ্রহ হয়। কুরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারবে, বিক্রি করে টাকা পরিবারে খরচ করা যাবে না। এ কারণে চামড়ার টাকা ধর্মপ্রাণ মানুষ মাদ্রাসায় দান করেন। কয়েক বছর ধরে চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না। মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর চামড়ায় লবণ লাগানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটা সঠিক পদ্ধতি নয়।

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, কাগজে-কলমে আধুনিক এই চামড়া শিল্পনগরী এখন স্থানীয় মানুষের কাছে অভিশপ্ত এলাকা। বর্জ্য আর উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ তারা। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত কোনো প্রক্রিয়া নেই। এমনকি কঠিন বর্জ্য চোরাপথে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে পোলট্রি খামার ব্যবসায়ীদের কাছে। পোলট্র খাবার হিসাবে এই বর্জ্য ব্যবহার হওয়ায় মানুষের মধ্যে কঠিন বর্জ্যরে তেজস্ক্রিয়তা প্রবেশ করছে। পানিতে মেশার কারণে মাছ ক্রোমিয়ামযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ঘাসের মধ্যে মিশে যাওয়ায় পশুখাদ্যের মাধ্যমে পশুর মধ্যে চলে যাচ্ছে ক্রোমিয়াম। বুড়িগঙ্গার পর এবার ধলেশ্বরী নদী ইতোমধ্যে মাছশূন্য হয়ে গেছে। বর্ষার সময় স্রোতের কারণে ধলেশ্বরীর পানি কিছুটা পরিষ্কার দেখা গেলেও শুকনা মৌসুমে পানির রং পরিবর্তনের বিষয়টি চোখে পড়ে।