রাজধানীর অস্থায়ী কুরবানি পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাই দুই সিটি প্রশাসকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে হাটগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কিছু হাটের ইজারাদারও চূড়ান্ত হয়েছে। কয়েকটি হাটের দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান। আবার কিছু হাটের আগ্রহী ইজারাদার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ১৫টি হাট ইজারা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৭টির দরপত্র চূড়ান্ত হয়েছে। বাকি ৪টির কাঙ্ক্ষিত দর মিলেছে। কয়েকদিনের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ৪টি বাজারের কাঙ্ক্ষিত দর ও আগ্রহী ইজারাদার না পাওয়ায় দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। পাশাপাশি কিছু এলাকায় নতুন করে হাট বসানোর আবেদন জমা পড়েছে। সে কারণে শেষ পর্যন্ত ডিএনসিসির হাটের সংখ্যা কমবেশি হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১২টি হাট বসানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ৮টির ইজারাদার চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যগুলোর প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
একটি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতা মিলেছে বলে জানা গেছে। এখন চলছে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কার্যক্রম। বাকি দুটি হাটের ইজারাদার ও কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় সিদ্ধান্ত ঝুলে রয়েছে। তবে দুই সিটির অস্থায়ী ২৭টি হাটের বাইরেও গাবতলী এবং সারুলিয়ার স্থানীয় হাটে কুরবানি উপলক্ষ্যে থাকছে বিশেষ আয়োজন।
জানা যায়, এবার নগরীর অস্থায়ী কুরবানি পশুর হাটগুলো বাগিয়ে নিতে প্রকাশ্য ও গোপনে প্রচেষ্টা চালান সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। নতুন মুখ হিসাবে জামায়াতের কিছু নেতাকর্মীও রয়েছেন। কিছু হাটের পেছনে রয়েছে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। কয়েকটি হাটের ইজারাদারের রাজনৈতিক পরিচয় মিললেও বেশির ভাগ হাটের ইজারাদারের রাজনৈতিক পরিচয় মেলেনি। তবে সেসব হাট কোনো পেশাদার ব্যবসায়ী পেয়েছেন, এমনও নয়। স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীরা হাটগুলোর নেপথ্য ইজারাদার।
ঢাকা উত্তর সিটিতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ইজারার সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য মেলেনি। তবে ঢাকা দক্ষিণের দুটি হাটের সঙ্গে জামায়াত নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার কথা জানা গেছে। জামায়াতের স্থানীয় সংসদ-সদস্যের এলাকায় ওই দুটি হাটের অবস্থান।
আরও জানা যায়, প্রতিবছর ইজারার বাইরেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কুরবানি পশুর অস্থায়ী হাট বসে। এবারও কয়েকটি এলাকায় সে ধরনের হাট বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এসব হাট একেবারে শেষ পর্যায়ে দেওয়া হয়। উন্মুক্ত দরপ্রক্রিয়া ছাড়াই এসব হাটের সরকার নির্ধারিত মূল্যে আগ্রহী ব্যক্তিকে ইজারা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন নেয়।
এর বাইরে সিটি করপোরেশনের সীমানার মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীরা অবৈধ হাট বসান। এবারও সে আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপিদলীয় প্রশাসক হওয়ায় তারা সেগুলো কীভাবে ম্যানেজ করবেন, নানা কথাবার্তা হচ্ছে। যদিও প্রশাসকরা বলেছেন, অবৈধ হাট বসানোর সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। আগের মেয়র বা প্রশাসকরাও এভাবেই বলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবৈধ হাট কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করেননি।
ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করার সুযোগ নেই। হাট ইজারার সঙ্গে সিটি করপোরেশন ছাড়াও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পিপিআর অনুসরণ করে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সূত্র জানায়, স্থানীয় পর্যায়ে দরপত্র সমঝোতা হয়ে যাচ্ছে। আগ্রহীরা নিজেরাই সমঝোতা করে আবেদন করেন। এক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি বিভিন্ন নামে একাধিক আবেদন করছেন। তারাই আবার হাট পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে প্রভাবশালীরা অন্যদের ভয়ভীতি দেখান।
ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা জানান, দলীয় প্রশাসক বা মেয়র শুরুতে হাট ইজারার ব্যাপারে কঠোরতা দেখান। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ে বসানো হাটের ব্যাপারে নমনীয়তা দেখান। যদিও প্রশাসক কঠোর অবস্থানে আছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান যুগান্তরকে বলেন, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কুরবানি পশুর অস্থায়ী হাটের ইজারা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দরদাতাই হাটের ইজারা পাচ্ছেন। দলীয় বিবেচনায় কাউকে সহযোগিতা করা হচ্ছে না। আইনগতভাবে এর কোনো সুযোগও নেই। আর নগরীতে দলীয় পরিচয়ে কাউকে অবৈধ হাট বসাতে দেওয়া হবে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম জানান, হাট ইজারা প্রক্রিয়া আইনগত দিক অনসুরণ করে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এখানে কাউকে অবৈধ কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আইনগতভাবে এর কোনো সুযোগও নেই। তিনি বলেন, দলীয় পরিচয়ের সুবিধা নিয়ে কাউকে নগরীতে অবৈধ হাট বসাতে দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন কঠোর অবস্থানে থাকবে। হাটগুলোর শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো গাফিলতি থাকবে না।