ঘড়ির কাঁটায় তখনও ১১টা বাজেনি। দক্ষিণ ঢাকার কাজলা ভাঙ্গা প্রেস এলাকার প্রধান সড়কের ওপর টিসিবির ট্রাক পৌঁছাতেই লাইনে জায়গা ধরতে পড়িমরি ছুটছে আশপাশের লোকজন। সময় যত গড়াচ্ছে, ভিড়ও তত বাড়ছে। এর মধ্যে হুটহাট হট্টগোল বাধছে। লাইনে কে আগে দাঁড়াবে, তা নিয়ে চলছে লড়াই। গতকাল কাজলার ভাঙ্গা প্রেস এলাকায় টিসিবির ট্রাকসেল পয়েন্টে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
বাজারে বাড়তে থাকা নিত্যপণ্যের দামে হাঁসফাঁস দশা নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের। তাদের কাছে বাজার যেন এখন এক জ্বলন্ত উনুন। তেল, ডাল থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ডিম, এমনকি সবজির বাজারেও খরচের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। প্রতিদিন অন্যান্য জেলার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনি বিক্রি করছে সংস্থাটি। বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে পাওয়ায় টিসিবির এসব ট্রাক ঘিরে প্রতিদিন পণ্যপ্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
একটি ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা প্যাকেজ আকারে দুই লিটার ভোজ্যতেল, এক কেজি চিনি ও দুই কেজি মসুর ডাল কিনতে পারছেন। এ ক্ষেত্রে ভোজ্যতেল ১৩০ টাকা লিটার, চিনি ৮০ টাকা কেজি ও মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি হিসেবে প্যাকেজের দাম পড়ছে ৪৮০ টাকা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এই পরিমাণ পণ্য কিনতে খরচ পড়বে অন্তত ৬৬৫ টাকা। অর্থাৎ টিসিবির প্যাকেজে সাশ্রয় হচ্ছে ১৮৫ টাকা। তবে লাইনে দাঁড়ানো নারী-পুরুষ মিলিয়ে শুধু প্রথম ৪০০ জনের কপালেই জুটছে টিসিবির পণ্য। তাই লাইনে আগে জায়গা পেতে মরিয়া অপেক্ষমাণ ক্রেতারা। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে জায়গা ধরে রাখতে লড়াই করতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিক্রয়কর্মীরা সবাইকে সিরিয়াল নম্বর দিলেও লাইনে তর্কাতর্কি থেমে নেই। দুটি লাইনে মধ্যবয়সী নারী-পুরুষের পাশাপাশি রয়েছেন প্রবীণরা। ধাক্কাধাক্কির মাঝে খেই হারিয়ে ফেললেও নিজের জায়গা ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ মো. নবী হোসেন।
কথা হলে তিনি বলেন, ‘গতকাল আইসা পাই নাই। তাই আইজ বৃষ্টি হইলেও আগেভাগে আইসা লাইন ধরছি। কিন্তু জুয়ান ব্যাডাগো লগে ধাক্কাধাক্কিতে পারন যায় না। যাতাযাতিতে দম বাইর হইয়া যায়। তারপরও কষ্ট কইরা দাঁড়াইছি। বাজারের চাইতে দাম কম। বাইচা যাওয়া টাকা সংসারের অন্য কাজে লাগানো যাইবো।’
আরেকজন ক্রেতা মো. দেলোয়ার মিঞা বলেন, ‘বাজারে তো মেলা দাম। এইখানে কষ্ট হইলেও যে টাকা বাঁচে, তা দিয়া এক-দুই দিনের বাজার হইয়া যায়। তাই লাইনে জায়গা ধরতে এই লড়াই করতাছি।’
কাজলার লাইনে দাঁড়ানো রিজিয়া পারভিন নামে এক নারী বলেন, ‘প্রতিবেশীগো লগে সেই রায়েরবাগ থেইকা আইছি। এখন আর ওইদিকে ট্রাক দেহি না। খবর পাইয়া এইখানে আইছি। কিন্তু সিরিয়াল পাইলাম না। ভাবলাম বৃষ্টির মধ্যে লোক কম হইবো। কিন্তু ভিড় তো মেলা। টিসিবির ট্রাক কবে, কোনহানে, কয়টায় আইবো, এইটা যদি জানা যাইত, তাইলে আমগোর কষ্ট কমত।’
রিজিয়ার প্রতিবেশী ফাতেমা খাতুনেরও একই অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘আগে থেইকা জানা থাকলে এমনে এইহানে-ওইহানে টাক খাইয়া বেড়ানো লাগত না। বেশি দূরে তো যাইতে পারি না। যাইতে-আইতে ভাড়ায় টাকা খরচ হয়।’
গত সোমবার থেকে চালু হওয়া এ ট্রাকসেল কার্যক্রম চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন ট্রাকপ্রতি গড়ে ৪০০ মানুষের জন্য পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ২৮ লাখ ৮০ হাজার উপকারভোগীর কাছে ১৩ হাজার ৯৩৯ টন পণ্য পৌঁছাবে টিসিবি। কিন্তু উপকারভোগীদের আক্ষেপ, ট্রাকপ্রতি যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অল্প সময়ে ফুরিয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে পণ্যের প্রত্যাশায় ছুটে এসেও অনেককে খালি হাতে ফিরে যেতে হয়।
গতকাল দুপুরে মানিকনগর বিশ্বরোডে বাসস্ট্যান্ডের ধারে টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য পাননি মো. রহমত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘সকালের দিকে বৃষ্টি, এখন আবার রোদ। এর মধ্যেও চেষ্টা করছি। কিন্তু পণ্য পাই নাই।’ তিনি অভিযোগ করেন, অনেকে পরিবার একাধিক সদস্যকে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত পণ্য নিচ্ছে। এতে অনেকে পণ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
জানতে চাইলে এখানকার টিসিবির ডিলার নজরুল স্টোরের মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তিন ঘণ্টার মধ্যে পণ্য বিক্রি শেষ। হালকা বৃষ্টি থাকলেও পণ্য বিক্রি থেমে থাকেনি। পণ্যের চেয়ে ক্রেতা অনেক বেশি। যারা পণ্য পান না, তাদের অনেক অভিযোগ। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই।’
কাজলায় পণ্য বিক্রয়কারী টিসিবির ডিলার রাশেদ ট্রেডার্সের রাশেদুল করিমও বলেন, ‘আমাদের সীমিত পণ্য। যে পরিমাণ পণ্য পাই, তা তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পণ্য কিনতে মানুষ আসে দ্বিগুণ। তাদের ফিরিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় গন্ডগোলও বাধে। এগুলো সামাল দিতেও বেগ পেতে হয়।’
টিসিবি জানিয়েছে, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ১১ মে থেকে ২১ মে পর্যন্ত ১০ দিন ধরে চলবে এ বিশেষ ট্রাকসেল কার্যক্রম। গত সোমবার থেকে চালু হওয়া এ ট্রাকসেল কার্যক্রম চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত। কিন্তু বছরজুড়েই ট্রাকসেল অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন উপকারভোগীরা।
মানিকনগর ও কাজলার পণ্যপ্রত্যাশীরা বলছেন, বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে ট্রাকসেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে তাদের। তাই সারা বছর এমন কার্যক্রম চললে তাদের টিকে থাকা কিছুটা সহজ হবে বলে জানান তারা। সেই সঙ্গে পণ্যের চেয়ে চাহিদা বেশি হওয়ায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বেশি জায়গায় বিক্রির দাবি জানান তারা।
বাজারে স্বস্তি ফেরানোর তাগিদ দিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাবেক সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে; মূল্যস্ফীতিও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ট্রাকসেল চালু অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে এটা কোনো সমাধান নয়। আমাদের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে বেশি জোর দিতে হবে। সরবরাহ বাড়িয়ে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনতে হবে। যেসব কারণে দাম বেড়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়, প্রতিযোগিতায় ঘাটতি, কারসাজি—এগুলো বন্ধ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে অনেক কষ্টে আছে নিম্ন আয়ের মানুষ। সে তুলনায় টিসিবির পণ্যের মাধ্যমে অল্প সংখ্যক মানুষ কিছুটা উপকৃত হচ্ছেন। এর বরাদ্দ ও পরিধি বাড়াতে পারলে ভালো। তবে বাজারে পণ্যের দাম সহনশীল পর্যায়ে আনতেই হবে। বাজারে নিবিড় মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই।’