Image description

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আর্থিক খাত গভীর সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু কেনার জন্য ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার চাহিদা পৃষ্ঠা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এতে বেশির ভাগ ব্যাংক তাদের কার্যক্রম চালাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

সরজমিন কয়েকটি ব্যাংকের শাখায় দেখা গেছে, গ্রাহকদের অতি প্রয়োজনের টাকা না পাওয়ার বেশ কিছু চিত্র। এর আগে ২০২৫ সালে ব্যাংকে টাকার ক্রাইসিস হলে গ্রাহকদের প্রয়োজন ছাড়া টাকা না তোলার আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র বলছে, ইতিমধ্যেই টাঁকশালের কাছে কমপক্ষে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন জানিয়েছে, কাগজ ও কালির সংকটের কারণে সর্বোচ্চ ৮ হাজার কোটি টাকার নোট সরবরাহ করা সম্ভব। ফলে ঈদের আগে নগদ ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে চাপ ও ঘাটতির পরিস্থিতি।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কেবল সাময়িক নগদ সংকট নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল সুশাসন, বেপরোয়া ঋণ বিতরণ এবং ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সম্মিলিত ফল।

তারল্য সংকট হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ না থাকায় গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় ব্যাংকের কাগজে সম্পদ বা বিনিয়োগ থাকলেও সেগুলো দ্রুত নগদে রূপান্তর করা যায় না। ফলে স্বল্পমেয়াদে আমানত ফেরত দেয়া, ঋণের দায় পরিশোধ বা দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনায় চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, যে তারল্য সংকট রয়েছে তা দ্রুতই সমাধান হয়ে যাবে।

গ্রাহকরা জানান, বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের সম্পূর্ণ টাকা একসঙ্গে ফেরত দিতে পারছে না, যার কারণে দৈনন্দিন খরচ থেকে শুরু করে চিকিৎসা ব্যয়ের মতো জরুরি প্রয়োজনেও টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে সামনে কোরবানির ঈদ। এখন নগদ টাকার বেশি প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংক টাকা দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে পুরনো নকশার বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার অর্ধপ্রস্তুত নোট টাঁকশালে মজুত রয়েছে। প্রয়োজনে এসব নোট দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাজারে ছাড়া সম্ভব। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত এসব নোট বাজারে ছাড়াতে রাজি নন। কারণ এরই মধ্যে নতুন নকশার নোট বাজারে আনতে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সম্পন্ন হতে সাধারণত ১০ থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে। এ কারণে একসঙ্গে সব মূল্যমানের নতুন নোট সরবরাহে দেরি হচ্ছে এবং সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রচলিত ছাপানো নগদ টাকার চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। এসব নগদ অর্থের একটি বড় অংশ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি দেশের প্রায় ১২ হাজার ব্যাংক শাখার ভল্টে থাকে আনুমানিক ১৬ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখার কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নগদ অর্থ সংরক্ষিত থাকে।
ব্যাংকাররা জানান, নিয়ম অনুযায়ী বাজার থেকে পুরনো, ছেঁড়া-ফাটা ও অপ্রচলিত নোট সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো চাহিদামতো নতুন নোট না পাওয়ায় তা যথাযথভাবে করা যাচ্ছে না। ফলে বাজারে ছেঁড়া-ফাটা নোটের পরিমাণও বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ লেনদেনে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।

ব্যাংকপাড়ায় মোটাদাগে তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে- গ্লোবাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, আইসিবি, ইউনিয়ন, এক্সিম, পদ্মা ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের আর্থিক খাতের দুরবস্থার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত, তবে এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন ও সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমানত কম আসছে। আবার ঋণের চাপ রয়েছে। এছাড়া সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের সংকট রয়েছে।